Connect with us

জাতীয়

এক ক্লান্ত স্বপ্নবাজের বিদায় !

| নুর হোসেন সোহেল

Published

on

অবশেষে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে নির্বাচন ঘোষণা করলেন ড. ইউনূস।
আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এমনটাই জানালেন তিনি।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই অনিবার্য হয়ে উঠল তাঁর বিদায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বিদায় নেওয়ার আগে,
জাতির উদ্দেশ্যে আজকের ভাষণে ড. ইউনূস ছিলেন ভীষণ ভারাক্রান্ত, যেন হাল ছেড়ে দেওয়া এক যোদ্ধার শেষ আর্তি।

চোখেমুখে ক্লান্তি, কণ্ঠে হতাশার সুর—এই মানুষটি কিছু করে যেতে চেয়েছিলেন, দেশের জন্য, মানুষের জন্য।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অজস্র বাধা, নানান রকম অন্তর্ঘাত, স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচার আর
দুর্নীতির ঘূর্ণিপাকে আটকে গিয়েছিল তাঁর স্বপ্নপূরণের পথ।

চেয়ার গ্রহণের পর থেকে তার শাসনামলে দেশে ঘটেছে ১৭৪টি আন্দোলন। ভয়াবহ বন্যা, বিমান দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা সংকট—প্রতিটি ঘটনা যেন তাঁর কাঁধে ভার হয়ে জমা হয়েছে।
সেনাপ্রধান মানেন না চেইন অব কমান্ড, পুলিশ ব্যর্থ নিরাপত্তা দিতে, আমলারা এখনও আগের সরকারের ছায়া থেকে বের হতে পারেননি।
রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাব তো আছেই।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো—তিনি চাইলেও সিস্টেম তাঁকে কাজ করতে দেয়নি।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মামলাটি নতুন করে তদন্তে আনতে চেয়েছিলেন ড. ইউনূস।
কিন্তু সেটিও আটকে যায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা স্তরে যেভাবে বাধা এসেছে—তা একজন ভালো মনের মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তবুও তিনি চেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে গড়া নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও ফেইস ভ্যালু কাজে লাগিয়ে
চেয়েছিলেন বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে, দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে।
একসময় রিজার্ভ পৌঁছেছিল ৩০ বিলিয়ন ডলারে—যা তাঁর নেওয়া কিছু সাহসী সিদ্ধান্তের ফলাফল।

কিন্তু পরবর্তীতে হতাশ হয়েই তিনি উপলব্ধি করেন—এই দেশে ‘সিস্টেমেটিক দুর্নীতি’ যেন স্বাভাবিক।
চাঁদাবাজি আর লুটপাট হয়ে গেছে নিয়মের অংশ।
যার ফলে, যতই চেষ্টা করুন না কেন—একজন ইউনূস একার পক্ষে পুরো ব্যবস্থাকে বদলানো সম্ভব নয়।

আজ আপনি তাঁকে গালি দিতে পারেন।
‘সুদখোর’, ‘আমেরিকার দালাল’ ইত্যাদি নানা বিশেষণ দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ট্রল করতে পারেন।
তবুও কেউ আপনাকে গ্রেপ্তার করবে না, জেলে পাঠাবে না।
এটাই ছিল তাঁর শাসনব্যবস্থার পার্থক্য।

কিন্তু ভবিষ্যতের কেউ যখন আসবেন, আর যদি ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয়, তখন এভাবে প্রকাশ্যে কিছু বলার
সাহস অনেকের থাকবে না। তখন হয়তো আপনাকেই দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হবে অন্যায়, দুর্নীতি।

ড. ইউনূস হয়তো সবকিছু পারেননি, পারেননি তাঁর বড় স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে।
কিন্তু অন্তত চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর মনে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতিকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রত্যাশা।

আজ তিনি বিদায় নিচ্ছেন—হয়তো আর কোনোদিন ক্ষমতার চৌকাঠে ফিরবেন না।
কিন্তু থেকে যাবে তাঁর সেই অপূর্ণ স্বপ্নগুলো, ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস, আর ইতিহাসের পাতায় লেখা এক পরিশ্রান্ত সৈনিকের নাম।

একজন ইউনূস চলে যাবেন।
কিন্তু এমন আর একজনকে কি আমরা সহজে খুঁজে পাব?

Exit mobile version