Connect with us

সম্পাদকীয়

দল গড়ার উৎসব, আদর্শের অনশন

নুর হোসেন সোহেল

Published

on

গত আট মাসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেন হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে এক ধরণের অদ্ভুত উৎসব—দল গড়ার উৎসব! এ সময়ের মধ্যেই আত্মপ্রকাশ করেছে প্রায় ২৬টি নতুন রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্ম। এ এক রাজনৈতিক প্রজননের বিস্ময়! এত সংখ্যক দলের উদ্ভবের ঘটনায় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে—তারা হঠাৎ এত সক্রিয় হলো কেন? তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? আর আদৌ কি এরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম?

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ‘নতুন’ দলগুলোর বেশিরভাগই আদর্শ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তিগত হতাশা, রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যান কিংবা ক্ষমতার লোভ থেকে জন্ম নিয়েছে। কেউ দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত, কেউ রাজনৈতিকভাবে অচল বা বিতাড়িত—তারাই এখন নতুন ব্যানারে ‘পরিবর্তনের দূত’ হয়ে উঠতে চাচ্ছে। আর এ দৃশ্য দেখে জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হলো—এইসব রাজনৈতিক দল কি আদৌ জনগণের কথা ভাবছে? না কি কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই এই ছলচাতুরি? অধিকাংশ দলেরই নেই কোনো জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম, নেই কোনো সুসংগঠিত কাঠামো, এমনকি নেই নির্দিষ্ট কার্যালয়ও। ফেসবুক লাইভ, প্রেস ব্রিফিং আর একদল অনুসারী নিয়ে যেন দল গঠন এখন এক প্রকার ট্রেন্ড—ঠিক যেমনটি আমরা দেখি সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ আন্দোলনে।

রাজনীতির এই হাস্যকর রূপান্তর আমাদের ভাবিয়ে তোলে। রাজনৈতিক দল গঠনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আদর্শ, দর্শন, ও জনগণের আস্থা অর্জন। কিন্তু আজ দল গঠন যেন পরিণত হয়েছে কাগজে নাম তোলার প্রতিযোগিতায়। নতুন দলের নাম শুনলেই মনে হয় যেন এক নতুন সূর্যোদয় ঘটছে—কিন্তু বাস্তবে তা কেবল এক মেঘলা বিকেলের আলো-আঁধারি।

আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে—এসব নতুন দলের বেশিরভাগই জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। যখন একটি দল জন্ম নেয় অস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে, কিংবা নেতৃত্বে থাকে বিতর্কিত চরিত্র, তখন সে দলের প্রতি জনগণের আস্থা জন্মায় না। মুখে সততার বুলি থাকলেই রাজনীতিতে জনসমর্থন মেলে না—বিশেষত তখন, যখন দলটির পেছনে থাকে অসততার ছায়া।

এইসব তথাকথিত দল নিজেদের ‘বিকল্প শক্তি’ বলে দাবি করলেও বাস্তবে তারা যেন এক একটি রাজনৈতিক বেলুন—মাঝেমধ্যে হাওয়ায় ভেসে ওঠে, আবার একসময় চুপচাপ চুপসে যায়। দল গড়ার উৎসব চলছে ঠিকই, কিন্তু আদর্শের চরম অনশন চলছে রাজনীতির মাঠজুড়ে। এই অনশন যদি না কাটে, তাহলে জনগণ যে পরিবর্তন চায়, তা কখনোই আসবে না।

একটি জাতির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি, যা নেতৃত্ব দিতে পারে, দিকনির্দেশনা দিতে পারে, এবং সর্বোপরি—জনগণের মনের ভাষা বুঝতে পারে। যারা কেবল নিজের সুবিধা বা স্বার্থরক্ষা করতে ‘দল’ গড়ে, তারা কোনোদিনই জনগণের ভরসা অর্জন করতে পারে না।

অতএব, প্রশ্নটা সবার জন্য—এই ‘দল গড়ার উৎসবে’ আমরা আসলে কী পাচ্ছি? আলোর আশ্বাস, না আরও বিভ্রান্তির অন্ধকার?

লেখক: নুর হোসেন সোহেল

পিএইচ-ডি গবেষক, যুক্তরাজ্য।

Exit mobile version