Connect with us

মতামত

নতুন দিগন্তের সন্ধানে নতুন সরকার

Published

on

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাম্প্রতিক দশকে একটি প্রভাবশালী গল্প হয়ে উঠেছে। তবে, এর সাথে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, যা দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে জটিল ও কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময়কালে দুর্নীতি, অপশাসন, সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্বজনপ্রীতির কারণে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের পরিবেশ সংকটে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ জনগণের কষ্ট বেড়েছে, এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। নতুন সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলোর সম্মুখীন হয়ে কীভাবে দেশকে একটি নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে, সেই বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রথমত, সিন্ডিকেটের সমস্যাটি বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার একটি বড় ধাক্কা। বিভিন্ন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, এবং জ্বালানি খাতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অযৌক্তিক মুনাফা আদায়ের ঘটনা বহুবার সামনে এসেছে। একদল ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগসাজশে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটকে ভাঙার জন্য নতুন সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারের নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে ব্যবসায়িক পরিবেশে স্বচ্ছতা আনার জন্য কার্যকর আইন প্রণয়ন ও কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নতুন সরকারের প্রধান কাজগুলোর একটি হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতির কারণে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমেছে, এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, সরকারি দপ্তরগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রশাসনিক দুর্নীতি কমিয়ে আনা সম্ভব। ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া, দেশীয় শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে।

তৃতীয়ত, নতুন সরকারকে শিল্প ও ব্যবসায়িক নীতিমালায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস গার্মেন্টস শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্যান্য শিল্প যেমন তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, এবং কৃষিজাত পণ্যের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। এ লক্ষ্যে নতুন সরকারকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) ও হাইটেক পার্কগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারকে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সহজে বিনিয়োগ করতে পারবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও উৎসাহিত হবে।

চতুর্থত, নতুন সরকারকে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে, যা শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারকে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে আরও উন্নত ও কর্মমুখী করে তোলা দরকার। শিল্প বিপ্লবের যুগে বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্ভাবন, এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য সরকারকে উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে এবং উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

পঞ্চমত, পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন থেকে শিল্প ও ব্যবসায়িক নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব শিল্প উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশকে শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এজন্য সরকারকে কঠোর পরিবেশগত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করবে। পরিবেশ সুরক্ষার মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব।

সাম্প্রতিককালে, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকার এই পরিবর্তনগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনসাধারণের আস্থা ফিরে পেতে, তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হতে হবে। এভাবে নতুন সরকার দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে একটি নতুন দিগন্তের সন্ধান দিতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার সরকার প্রতিষ্ঠা করা। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে, দুর্নীতি ও অপশাসন বন্ধ করতে, এবং একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এভাবেই বাংলাদেশ একটি নতুন দিগন্তের সন্ধানে এগিয়ে যেতে পারে, যেখানে দেশের জনগণ, ব্যবসায়ী ও সরকারের মধ্যে একটি সহানুভূতিশীল এবং সমন্বিত সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

এটি শুধু বর্তমানের সমস্যা সমাধান নয়, বরং দেশের একটি সুষম ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথও হতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নতুন সরকার একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ লাভ করতে পারবে ।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বত্ব © ২০২৬ বাংলা মিরর | সম্পাদক : মোঃ খায়রুল ইসলাম সাব্বির