চা শ্রমিকদের রক্তে চুমুক ও শোষণের জাঁতাকল

  • বায়েজিদ খান
  • ২৬,সেপ্টেম্বর,২০২২ ০৪:১২ PM

চা বাগান, পাহাড়ের কোলে সাজানো সবুজের সমারোহ দেখে চোখের ক্লান্তি দূর হয় আমাদের। এই চা বাগানের পাতা থেকে তৈরি চা আমাদের ক্লান্তি দূর করে, মনে শান্তি দেয়। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দশম বৃহৎম চা উৎপাদনকারী দেশ। 

সেই চা বাগানে শ্রমিকরা এই একবিংশ শতাব্দীতেও চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে  দৈনিক মজুরি পান ১২০ টাকা। সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করতে হয় তাকে। সপ্তাহ শেষে বিল পান ৭২০ টাকা। এই আয়েই পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হয় তাকে। নতুবা বাইরে কাজ খুজতে হয়। 

আর এই চায়ের টাকায় মালিকরা ক্রামাগত বড়লোক হচ্ছে। এসব শুনলে যে কারো চোখে ভেসে উঠবে মধ্য যুগীয় দাস ব্যবসার কথা। যাদের নূন্যতম বাচার অধিকার নেই। এই চা শ্রমিকদের ইতিহাস অনেক বড় ,তারা ব্রিট্রিশদের বিরুদ্ধে লড়ছে,পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ছে ,কিন্তু আজ একুশ শতকেও তারা যেন এদেশের কেউ না। শুরু থেকেই এই শ্রমজীবী মানুষগুলো চরম অবহেলিত তাদের ডাকা হতো কুলি বলে। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আসামে ও সিলেটে ব্রিটিশ চা ব্যবসায়ীরা যখন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা শুরু করেন, তখন স্থানীয়ভাবে চা-শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। আসাম সরকারের সহায়তায় তাঁরা ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো চা-শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করেন। বিহার, উড়িষ্যা ,মাদ্রাজ ,নাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ থেকে এসব চা-শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। 

মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব চা-শ্রমিকদেরও মন কেড়ে ছিলো। মুল্লুকে ফিরে চল’ স্লোগানে সিলেট অঞ্চলের হাজার হাজার হাজার চা-শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু করেন। উদ্যোগ নেন নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু ফিরে যাওয়া অত সহজ ছিল না। চা-শিল্পের মালিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রেল দপ্তর শ্রমিকদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যাতে শ্রমিকেরা ফিরে যেতে না পারেন। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর চলে গুলিবর্ষণ। মারা যান শত শত আর আহত হন হাজার হাজার। কিছু পালিয়ে যান। বাকিদের ধরে নিয়ে পুনরায় চা-বাগানের কাজে বাধ্য করা হয়,চলে অত্যাচার। গঠিত হয় অনেক কমিশন।কিন্তু কিছুই বদল আসে না। 

তারপর ব্রিটিশ গেছে ,পাকিস্তান গেছে ,বাংলাদেশ হয়েছে লাভের লাভ কিছুই হয়নি।দেশ আজাদ হয়েছে ,কিন্তু তাদের আজাদী হয়নি।১২০ টাকায় তাদের দিন কাটে। দেশে যে শ্রম আইন আছে তা তাদের কোন কাজেই লাগে না। চা ব্য্যবসায়ীরা  ম্যনাজার নিয়োগ দেন তারা বাংলোতে থাকেন। এই বাংলো ব্রিটিশ সাহেবদের জন্য করা  হয়েছিলো,জঙ্গল কেটে তা করতে অনেক শ্রমিক মারা গেছে।  কিন্তু আজো শ্রমিকরা মাটির ঘরে থাকে। দেশ থেকে জমিদারি গেছে কিন্তু চা বাগানে এখনো জমিদারি থেকে গেছে। চা বাগানের ম্যানেজার ও মালিক তাদের কাছে ‘মা-বাপ’। 

বাংলাদেশের চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার-পরিজন শুধু দরিদ্র এবং শোষিতই নয়। বিভিন্ন ভাষা, জাতি-পরিচয়, ধর্ম, সংস্কৃতি কারনে এরা দেশ সমাজের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর তার ফায়দা তুলছে চা ব্যবসায়ী নামক বেনীয়া গোষ্ঠী।

সম্পর্কিত খবর