নবোকভের "লোলিতা": উপভোগ্য হলেও মহৎ সৃষ্টি নয়

  • মো. আব্দুর রাজ্জাক
  • ০২,আগস্ট,২০২২ ০৮:১৮ PM

কেউ কেউ বলেন, আজ পর্যন্ত  ‍বিশ্বসাহিত্যে মনোবিকলনভিত্তিক যত উপন্যাস রচিত হয়েছে তাদের মধ্যে রুশ বংশোদ্ভূত মার্কিন উপন্যাসিক ভ্লাদিমির নবোকভের ‘লোলিতা’ই শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সামাজিক পটভূমিতে ‍রচিত এ উপন্যাসে লেখক একজন মধ্যবয়সী উচ্চ শিক্ষিত মানুষের যৌন জীবনের কতিপয় অস্বাভাবিক দিক তুলে ধরেছেন। গল্পের নায়ক হামবার্ট  ফ্রান্স থেকে আমেরিকায় আসা ইংরেজি সাহিত্যের একজন অধ্যাপক। যৌনজীবনে হামবার্ট যথেচ্ছা বহুগামী। কিশোর বয়সে আন্নাবেল নামের এক কিশোরীকে ভালবাসতেন তিনি। কিন্তু তার বাল্য প্রেম কাঙ্খিত পরিণতি লাভ করতে পারেনি। তবে হামবার্ট কোনদিনই  ভুলতে পারেন না তার  প্রথম প্রেমের কথা; ভুলতে পারেন না অপরিণত বয়সের প্রথম প্রেমিকার  অপরিণত কিশোরী দেহসৌষ্টব । পরিণত জীবনে হামবার্ট শত শত নারীর সাহচর্যে এলেও অপরিণত প্রেমিকার কুঁড়িকোমল শরীরের সৌন্দর্য আর কোথাও খুঁজে পান না।   তাই শত নারী রমণেও তিনি থাকেন অতৃপ্ত। যৌনসঙ্গী হিসেবে  তাই হামবার্ট খুঁজতে থাকেন আট থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের বালিকাদের। মাঝে মাঝে পতিতালয়ে অল্প বয়স্কা মেয়েদের পেলেও তারা হামবার্টের কিশোরী প্রেমিকা আন্নাবেলের মতো কেউ হয় না। তাই তার অতৃপ্তি আর দূর হয় না। 
   
 প্রফেসার হামবার্ট একবার একটি ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক লেখার জন্য নিরিবিলি পরিবেশের প্রত্যাশায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ডের ছোট্ট  শহর রামসডেলে যান। সেখানে বসবাসের জন্য তিনি যুৎসই একটি বাসার খোঁজে জনৈক বিধবা হারসেল হেজের বাড়িতে যান। এ বাসায় হামবার্ট মিসেস হেজের বার বছর বয়সী কন্যা ডলোরেস হেজ বা ডলিকে স্বল্প বসনে রৌদ্রস্নানরত অবস্থায় দেখে বিমোহিত হয়ে পড়েন। মিসেস হেজের বাসাটি তার কাজের জন্য উপযুক্ত বলে পছন্দ না হলেও প্রফেসার হামবার্ট সেটা ভাড়া নেন এই লোভে যে সেখানে বসবাস করলে তিনি নাবালিকা ডলোরেসের সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন যা শেষ পর্যন্ত তার বালিকা প্রেমিকার সাথে অতৃপ্ত যৌনতার কিছুটা হলেও ক্ষপিপূরণ করতে পারবে। 

প্রফেসার হামবার্ট তার যৌন লক্ষ্য নিয়ে চতুরতার সাথে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি ডলোরসের মন জয়ের চেষ্টার প্রাথমিক সাফল্য পেলেন। কারণ ক্রমান্বয়ে ডলোরেসও তাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে। ডলোরসকে নিয়ে তার প্রেমাকাঙ্খার কাহিনীগুলো লিখতে শুরু করেন হামবার্ট। এখানে তিনি ডলোরেসের ছদ্মনাম তিনি দেন ‘লোলিতা’। এই লোলিতাকে নিয়েই প্রায় দুইশত পাতার এ উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে চলে।

 লোলিতাকে নিয়ে যৌনকামনা সম্বলিত এক স্বপ্নের সৌধ  গড়ে তোলেন হামবার্ট। প্রৌঢ়প্রায় জীবনে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকাদের সাথে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলা তার কাছে সঙ্গত মনে হলেও সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান সমাজে যে তা রীতিমত অপরাধ হার্মাট তা ভালভাবেই বোঝেন। তার বসবাসকারী রাষ্ট্র আমেরিকায় আঠার বছর বয়সের কম বয়সী নারীদের বিয়ে করা রীতিমত অপরাধ কিন্তু  পাশচাত্য জগতের মূল্যবোধ দিয়ে তো আর সারা বিশ্ব চলে না। ইউরোপ বা আমেরিকায় দ্বাদশবর্ষীয়া বালিকার সাথে চল্লিশোর্ধ পুরুষের বিয়ে অসম্ভব হলেও এশিয়া, আফ্রিকান সমাজে বিষয়টা  তখনও দুষনীয় সামাজিক আচার ছিল না।  এ খবর জানা ছিল হার্মাটের । কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনে যাই থাকুক না কেন  প্রত্যেক ব্যক্তিই তার ব্যক্তিগত জীবনে ভিন্নতর আদর্শ পোষণ করে।  প্রফেসার হামবার্টও তার কোন ব্যতিক্রম নন। তিনি বালিকা ডলোরসের সাথে তার প্রেম ক্রিড়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে থাকেন।

কিন্তু ঘটনাটি কেবল ডলির প্রতি হামবার্টের অসম প্রেমাকাঙ্খার হলে তেমন জটিল হত না। বস্তুত হামবার্ট ডলির প্রেমে পড়লেও ডলির মা হারসেল  হেজ গোপনে গেপানে হামবার্টের প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। অনেকবার চেষ্টা করেও মিসেস হেজ তা হামবার্টের কাছে উত্থাপন করতে পারেন না। অবশেষে একবার ডলির স্কুল থেকে  সামার ক্যাম্পের আয়োজন করা হলে মিসেস হেজ ডলিকে অন্তত কিছু দিনের জন্য বাসার বাইরে পাঠিয়ে নিরিবিলি পরিবেশ তৈরির সুযোগ পান।  ডলিকে সামার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়ার পর এক চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি মিসেস হেজ হামবার্টকে জানিয়ে দেন। কিন্তু যার নাবালিকা মেয়েকে নিয়ে হামবার্ট যৌনজীবনের কঠিন ছক তৈরি করে ফেলেছেন তাকে তিনি কিভাবে বিয়ে করবেন?  তার কাঙ্খিত যৌনবস্তু তো মিসেস হারসেল নন, তার নাবালিকা মেয়ে ডলি।

কিন্তু গরজ বড় বালাই। হামবার্টের গরজ ডলিকে কাছে পাওয়া। তিনি যদি মিসেস হারসেলকে বিয়ে না করেন, তবে হয়তো তার বাসায় আর থাকা হবে না। তিনি তখন কেবল বাসাই হারাবেন না, ডলিকেও হারাবেন। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও হামবার্ট মিসেস হেজকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করে। এর ফলে হামবার্ট কেবল ডলির মাকেই নয়, ডলিকেও কাছাকাছি পেলেন।

হামবার্ট ডলিকে নিয়ে যে ডায়েরি লিখত যেখানে তার বিকৃত যৌনজীবনের কথা তথা ডলিকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্খা লিপিবদ্দ থাকত। ডলিকে সামার স্কুলে পাঠিয়ে দেয়ার ফলে ঐ বাসায় কেবল হামবার্ট আর মিসেস হেজই থাকতেন। একদিন ঘটনাচক্রে মিসেস হেজ ডলিকে নিয়ে লেখা হামবার্টের ডায়েরিটি আবিষ্কার করে তা পড়ে ফেলেন। ডায়েরির লেখা পড়ে তিনি বুঝতে পারেন, যে লোকটিকে তিনি নিজের স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি আসলে একজন শিশুকামে আসক্ত (Peadofile) বিকৃত রুচির মানুষ। আর তার একমাত্র শিশু কন্যা ডলিই তার বিকৃত যৌনাচারের শিকার।  তিনি এতদিন দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষে আসছেন।

এ নিয়ে হামবার্টের সাথে মিসেস হেজের রীতিমত বাকযুদ্ধ হয়।  কিন্তু হামবার্ট সব কিছু অস্বীকার করেন। তিনি ডলির মাকে বোঝাবার চেষ্টা করেন যে তিনি আসলে একটি নূতন উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছেন এবং সেই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর নাম মিসেস হেজ ও তার মেয়ে ডলির নামেই দেয়া হয়েছে। কিন্তু মিসেস হেজ হামবার্টের কথায় বিশ্বাস করেন না। মিসেস হেজ সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তার মেয়ে ডলিকে নিয়ে অজানা কোথাও চলে যাবেন যেখানে হামবার্ট তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেন না।

তবে মিসেস হেজ নিরুদ্দেশ হওয়ার পূর্বে হামবার্টের কুকীর্তি ও যৌন বিকার সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেয়ার সংকল্প করেন। এজন্য তিনি নানাজনের ঠিকানায় একটার পর একটা চিঠি লিখতে থাকেন। কিন্তু চিঠিগুলো শেষ পর্যন্ত কারো কাছে পৌঁছায় না। কারণ সেগুলো ডাকবাক্সে ফেলতে গিয়ে গাড়ি চাপায় মিসেস হেজ নিহত হন। চিঠিগুলো চলে আসে হামবার্টের হাতে। হামবার্ট চিঠিগুলো গোপনে নষ্ট করে ফেলেন। তাই তার বিকৃত যৌন জীবন সম্পর্কে কেউ আর জানতে পারে না।

মিসেস হেজের গাড়ি চাপায় নিহত হওয়ার সময় তার কন্যা ডলোরেস ডলি বা লোলিতা ছিল সামার ক্যাম্পে। হামবার্ট ডলিকে খবর না দিয়েই মিসেস হেজের অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন যা ছিল তার যৌনকামনা পূরণেরই একটি গোপন পরিকল্পনা। পরে তার পরিকল্পনামতো তিনি ডলিকে ক্যাম্প থেকে নিয়ে রামসডেল থেকে পালিয়ে বেড়াতে শুরু করেন। দিনের বেলা রাস্তায়, পার্কে বা দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন ও রাতে তারা হোটেলে কাটাতে শুরু করেন।
 
সামার ক্যাম্প থেকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে হামবার্ট প্রথম রাতেই ডলিকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে তাকে ভোগ করতে সচেষ্ট হয় । এখানে হামবার্ট  একটি নৈতিক দোটানায় পড়েন। তিনি ডলির দেহ উপভোগ করতে চান । তবে তার সতিত্ব হরণকারী প্রথম পুরুষ হতে চান না।  এ উভয় সঙ্কট থেকে তাকে স্বয়ং ডলিই উদ্ধার করে। কারণ ডলি তাকে জানায় যে সে সামার ক্যাম্পে থাকতেই অন্য পুরুষের কাছে তার সতিত্ব হারিয়েছে। তাই ডলিকে ভোগ করতে হামবার্টের আর কোন নৈতিক পিছুটান থাকল না।

 ডলিকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে ঘুরতে হামবার্ট নিউ ইংল্যান্ডের বিয়ার্ডসলি শহরে স্থায়ী হলেন। এ সময় তিনি নিজেকে ডলির পিতা পরিচয় দেয়া শুরু করেন। এখানে ডলিকে তিনি একটি বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তবে ডলি আর দশটা বালিকার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারত না। হামবার্ট সেখানে ডলির উপর অনেক বাধা নিষেধ আরোপ করে। সে সবার সাথে মিশতে পারত না, সবার সাথে সময় কাটাতে পারত না। কোন পার্টিতে বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সাথে অংশগ্রহণের সুযোগও ডলির ছিল না। 

অবশ্য স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মিসেস প্র্যাটলির  পিড়াপীড়িতে হামবার্ট ডলিকে একবার স্কুল কর্তৃক আয়োজিত একটি নাটকে অভিনয়ের অনুমতি দিতে রাজি হন। কিন্তু নাটকের চূড়ান্ত অভিনয় প্রদর্শনীর পূর্বেই ডলি আর হামবার্টের মধ্যে চরম মনোমালিন্য দেখা দেয়। ফলে ডলি ঐ শহরে আর থাকতে চায় না। তারা গোপনে বিয়ার্ডলি শহর ছেড়ে আবার অজনার পথে পাড়ি দেয়।

কিন্তু সকলের অগোচরে শহর ছাড়লেও ভ্রমণকালীন হামবার্ট লক্ষ করেন যে  হয়েতো কোন এক অপরিচিত লোক তাদের অনুসরণ করছে। সেই অপরিচিত অনুসরণকারীকে সর্বতা হামবার্ট অনুসরণ করার চেষ্টায় থাকে। এক সময় নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে হামবার্ট বুঝতে পারেন যে অনুসরণ করা লোকটিকে তিনি চিনতে না পারলেও  লোকটি ডলির পূর্ব পরিচিত। কিন্তু  ডলি তা অস্বীকার করে। 

  পলাতক জীবনের এক পর্যায়ে ডলি জ্বরে আক্রান্ত হলে হামবার্ট তাকে কোন এক ছোট শহরের হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। এ সময় ডলিকে হাসপাতালে আর হামবার্ট একা থোকেন হোটেলে । এ অবস্থায় ডলি হাসপাতাল থেকে নিরুদ্দেশ হয়। হাসপাতাল থেকে জানান হয়, ডলির এক চাচা হাসপাতালের সকল বিল পরিশোধ করে ডলিকে নিয়ে চলে গেছেন। তবে হামবার্ট বিশ্বাস করে ডলি আসলে নিজ ইচ্ছায় তাকে ছেড়ে যায়নি। কেউ না কেউ তাকে অপহরণ করেছে।
   
 এর পর হামবার্টের একাকীত্ব জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। তিনি হন্নে  হয়ে নানা স্থানে ডলিকে খুঁজতে থাকেন। কোথাও তার লোলিতাকে আর খুঁজে পান না। তার বহুগামী জীবনে আবার এক পতিতার সাথে তিনি কিছুটা অন্তরঙ্গ হন। কিন্তু শত নারী সম্ভোগেও তিনি তার বাল্য প্রেমিকার প্রতিমূর্তি ডলি ওরফে লোলিতাকে  ভুলতে পারেন না।

কেটে যায় দুবছর। একদিন তিনি ডলির লেখা একটি চিঠি পান। চিঠিতে ডলি জানায় যে সে বিচার্ড এম সিলার নামে এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছে। সে এখন সন্তান সম্ভাবা। সে খুবই ঋণগ্রস্ত। তাই তার টাকার দরকার। ডলির চিঠি পেয়ে অস্থীর হয়ে ওঠেন হামবার্ট। তবে  তিনি ধরে নেন ডলি ঋণগ্রস্ত হলেও নিশ্চয়ই সে তার অপহরণকারীর সাথেই ঘরসংসার করছে। 

তাই তার স্বামীকে খুন করে ডলিকে পুনরাধিকার করার সংকল্প করে হামবার্ট।  লোড করা পিস্তল নিয়ে তিনি ডলির ঠিকানা খুঁজতে থাকেন। ডলিকে উদ্ধার করার ইচ্ছার চেয়ে ডলিকে অপহরণকারী স্বামাকে হত্যা করাই তার মূল লক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ডলির ঠিকানায় গিয়ে হামবার্ট জানতে পারেন যে ডলির অপহরণকারী তার স্বামী রিচার্ড স্কিলার নয়, বরং তাদের পরিবারের বহুল পরিচিত ক্লেয়ার কুইটলিই ডলিকে অপহরণ করেছিল।

 কুইটলী একজন বিখ্যাত নাট্যকার যার লেখা নাটকেই বিয়ার্ডলি শহরে ডলির অভিনয় করার কথা ছিল। কুইটলি একজন নপুংসক। তাই ডলিকে সে ভোগ করার জন্য নয়, বরং তাকে দিয়ে পর্নো ছবি তৈরি করার মানসেই সে ডলিকে অপহরণ করেছিল।  কিন্তু ডলি তাতে রাজি হয়নি। তাই সে কুইটির দখল থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে থাকে এবং তারই পূর্ব পরিচিত রিচার্ড স্কিলারের সহায়তায় সে তার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয় এবং স্কিলাকে বিয়ে করে।

ডলির মুখ থেকে সকল ঘটনা শোনার পর হামবার্ট ডলির সকল ঋণ পরিশোধ করার জন্য অর্থ প্রদান করেন। এতে ডলি হামবার্টের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু হামবার্ট অর্থের পিছনের ইতিহাস বর্ণনা করে ডলিকে জানার যে এসব ডলার তার মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদেরই অংশ। এগুলো আসলে ডলিরই অর্থ, হামবার্টের নয়।

অতপর হামবার্ট এবার কুইটলির আস্তানায় গিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশে গুলি করে আহত করে। পুলিশ এসে হামবার্টকে গ্রেফতার করে। বিচারে তার জেল হয়। জেলখানায় বসে হামবার্ট তার জীবনস্মৃতি লিখেন। তার জীবনস্মৃতিতে ডলির প্রতি তার অসীম ভালবাসার প্রত্যয়যুক্ত বর্ণনা থাকে।  হামবার্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে তিনি শিঘ্রই মারা যাবেন।  আর ডলি বেঁচে থাকবে আরো অনেক বছর। তার আত্মসৃতির প্রকাশনা নিয়ে তার  শেষ ইচ্ছা ছিল যে এটা যেন তার মৃত্যুর পরে প্রকাশ করা হয়। তবে তার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই  সন্তান প্রসবকালীন ডলিরও মৃত্যু হয়।

টাইম- ম্যাগাজিন কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ১৯২৩-২০০৫ সালে ইংরেজি ভাষায় রচিত একশতটি উৎকৃষ্ট উপন্যাসের মধ্যে লোলিতা স্থান পেয়েছে। তবে অনেকে এ উপন্যাসকে শিশু ধর্ষণ অপরাধকে উৎসাহিত বা মহিমান্বিত করার একটি নিকৃষ্ট বর্ণনা হিসেবেও মনে করেন। এ উন্যাসের কাহিনী নিয়ে এখন পর্যন্ত একাধিক চলচ্চিত্র ও মঞ্চ নাটক নির্মিত হয়েছে। তবে একমাত্র অস্ট্রেলিয়া ছাড়া অন্য কোথাও এসব নাটক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন নিয়ে তেমন কোন প্রতিকূলতা রক্ষ করা যায়নি।

 আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, লোলিতা একটি ব্যতীক্রমধর্মী উপন্যাস। এখানে একটি নাবালিকা মেয়ের সাথে মধ্য বয়সী এক বিকৃতকাম পুরুষের যৌনক্রিয়ার বিবরণ থাকলেও সেগুলো একমাত্র ডলির নাবালকত্ব ছাড়া অন্য কোনভাবে দূষণীয় নয়। তবে নাবালিকা ডলির পক্ষে যৌনতাকে উপভোগ করার যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেটা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। অন্য দিকে উপন্যাসের  কাহিনীর সাথে ডলির এত সম্পৃক্ততা স্বত্ত্বেও তাকে কাহিনীতে হামবার্টের অতৃপ্ত বাল্য প্রেমের প্রতিক্রিয়ার একজন ভিকটিম হিসেবে ধরে নেয়া যায়। লেখক ঘটনাকে সব সময় হামবার্টের পক্ষেই বর্ণনা করেছেন এমনকি ডলির সতিত্ব হরণে প্রথম পুরুষ না হওয়ার যে বিচিত্র বাসনা তাও চরিতার্থ করা হয়েছে ডলির মুখ দিয়ে ইতোপূর্বে অন্য পুরুষ কর্তৃক ধর্ষিতা হওয়ার তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে। সব কিছু মিলে ভ্লাদিমির নবোকভের লোলিতা একটি উপভোগ্য উপন্যাস হলেও তা কোন মহৎ উপন্যাস বলে আমি মনে করি না।

সম্পর্কিত খবর

কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি