প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টাকারী "ফ্রিডম মিজান" গোপনে জামিনে মুক্ত

  • বাংলা মিরর ডেস্ক
  • ০৫,ফেব্রুয়ারি,২০২৩ ০৪:৫৯ AM

শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাকারী ফ্রিডম পার্টির সাবেক নেতা হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে 'টোকাই মিজান' ওরফে 'পাগলা মিজান' গোপনে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। 

মিজানকে জামিন করার পিছনে রয়েছেন মোহাম্মদপুরে বসবাসকারী আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। এছাড়া মিজানের পরিবারের তরফ থেকেও জামিনের চেষ্টা করা হয় অনেক দিন যাবত। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর জুয়ার বড় আসর হিসেবে পরিচিত ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সিলেটের শ্রীমঙ্গল সীমান্ত এলাকায়  র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন 'টোকাই মিজান'। তখন তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মিজান মানি লন্ডারিং, অবৈধ সম্পদ অর্জন, শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ বহু মামলার আসামি। 

সূত্র বলছে, গ্রেপ্তারের পর টোকাই মিজান সম্পর্কে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব কাহিনী। সিনেমার কাহিনীকেও হার মানিয়েছে এসব কাহিনি । জানা গেছে, এক সময় ঢাকার মিরপুরের টোকাই ছিলেন হাবিবুর রহমান মিজান। টোকাই থাকার কারণে তিনি 'টোকাই মিজান' হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান। মিরপুর থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে এসে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই করতেন। 

এক শীতের রাতে ছিনতাই করার সময় ফার্মগেটের খামারবাড়ীর খেজুর বাগান এলাকায় পুলিশের ধাওয়ার মুখে পড়েন। ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়া মসজিদের পাশের পুকুরে নেমে পড়েন। পুলিশ তাকে উঠানোর অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর উলঙ্গ অবস্থায় পুকুর থেকে উঠেন মিজান। এরপর থেকেই তিনি 'পাগলা মিজান' হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান। 

জানা গেছে, মিজান মূলত ফ্রিডম পার্টির সদস্য ছিলেন। ১৯৭৬ সালে ফ্রিডম পার্টির পক্ষ থেকে পাগলা মিজান, শামীম জালালী ওরফে দারোগার ছেলে শামীম, বাবুল ওরফে পিচ্চি বাবুলসহ কয়েকজন লিবিয়া গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ফ্রিডম পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নানা পরিকল্পনায় অংশ নেন মিজান ও তার ভাই ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা। 

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালায়। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমা বর্ষণ করে। হামলার সময় শেখ হাসিনা বাড়ির ভেতর অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। এ সময় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরাও পাল্টা গুলি চালান। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে হামলাকারীদের গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। 

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রম্নয়ারি শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটে লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুর রশিদ, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা ও নাজমুল মাকসুদ মুরাদসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়। 

অভিযোগপত্রে মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উলেস্নখ করা হয়। শেখ হাসিনার ওপর হামলার ঘটনায় মিজান ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর জোনের কো-অর্ডিনেটর। সরাসরি হামলায় অংশগ্রহণকারীদের সম্মুখসারিতে ছিলেন তিনি। মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাও ছিলেন হামলাকারী দলের সদস্য। ১৯৯৫ সালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মোস্তফা মারা যান। মৃত ব্যক্তিকে চার্জশিটভুক্ত আসামি করার আইনগত সুযোগ না থাকায় মোস্তফার নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়। 

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের তৎকালীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি হিসেবে লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এদের মধ্যে লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান ও মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম ক্ষমতায় গেলে মিজানও মোহাম্মদপুর এলাকার একজন শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার হাত ধরে আওয়ামী লীগে নাম লেখান। পরবর্তীতে তিনি মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবেই তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও নির্বাচিত হয়েছিলেন। 

সূত্রটি বলছে, 'পাগলা মিজানের' কুখ্যাতি থেকে নিজের নাম মুছে ফেলতে ১৯৯১ সালে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে নিজের পুরো নাম রেজিস্ট্রেশন করে রাখেন হাবিবুর রহমান মিজান। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে মোহাম্মদপুরের ইউনূস হত্যা, ২০১৬ সালে সাভার থানায় জোড়া হত্যা মামলা আছে। 

এছাড়া ২০১৯ সালে তুরাগ নদীর পাশে সিলিকন রিয়েল স্টেটের জমি দখলকে কেন্দ্র করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পাগলা মিজান মোহাম্মদপুর এলাকার যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলাম তুহিন, আদাবর এলাকার ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ আহম্মেদ ও সাইফুল এবং তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে হামলা চালায়। তারা সিলিকন রিয়েল এস্টেটের ৬ কর্মীকে গুলি করে আহত করে। প্রতিষ্ঠানটির ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা জুয়েল নামের প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মীকে গুলি করে আহত করে। পরে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে তার মৃতু্য নিশ্চিত করে। এরপর জুয়েলের লাশ তুরাগ নদীতে ফেলে দেয়। এমন ঘটনার দুই দিন পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা জুয়েলের লাশ উদ্ধার করেন। 

সূত্রটি বলছে, মিজানের উসকানিতেই ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর উর্দুভাষী অবাঙালিদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হন। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের একাধিক গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ওই ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় পুলিশ বাদি হয়ে একাধিক মামলা দায়ের করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের স্বার্থের বিষয়টি। জেনেভা ক্যাম্প ও ক্যাম্পের আশপাশের দোকানপাট ও বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ বিদু্যৎ সংযোগ এবং গ্যাস সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সূত্র ধরেই সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে। তার সঙ্গে আছে মাদক ব্যবসা। অবৈধ ব্যবসার লাখ লাখ টাকার অধিকাংশই যাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের পকেটে। সরকারের খাতায় এক পয়সাও জমা হয় না।

সম্পর্কিত খবর

কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি