মাতৃক্রোড় হল সভ্যতার সূতিকাগার

  • টি এস রহমান
  • ১৪,জানুয়ারী,২০২২ ০২:৪৩ PM

এটা সর্বজনস্বীকৃত এবং সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব গোত্রের নারীপুরুষ নির্বিশেষে বলেন, পৃথিবীর মধুরতম শব্দ হলো মা, মম, মাদার, মাম্মি।

ইদানীং শিক্ষা পাল্টে গেছে। এখন শেখানো হয়, পিতামাতা আমাদের বন্ধু। আ মলো, বলে কী! পিতামাতা বন্ধু হবেন কোন্ দুঃখে? বৃদ্ধ-অথর্ব-অক্ষম-অচল-অন্ধ যাই হোক না কেন, তাঁরা পিতামাতা, গুরুজন, পরম পূজনীয়। বন্ধু পাল্টানো যায় কিন্তু পিতামাতা তো অপরিত্যাজ্য। নাকি পাল্টাতে চান? 

আধুনিক সমাজ-ব্যবস্থায় বৈধ হতে পারে। আমার সন্তান গৃহশিক্ষককে ডাকে ভাইয়া, শুনে আমি যারপরনাই কষ্ট পাই। আমার না হয় কলেজপড়ুয়া ছেলে আছে। কিন্তু যাদের কলেজপড়ুয়া মেয়ে আছে এবং সেই মেয়েটি যদি আমার ছেলের মতো রূপবান হয় এবং সেই রূপবতী মেয়েটি যদি এই সুদর্শন গৃহশিক্ষককে ডাকে ভাইয়া, তখন? মোবাইল তো উভয়ের আছে এবং তাতে ভাইব্রেশনও দেয়া যায়। পিতামাতা নিশ্চয়ই সারারাত না ঘুমিয়ে মেয়েটিকে আগলে রেখে বসে থাকেন না। ছয়টি রিপু সবারই আছে। এগুলির নিয়ন্ত্রণই মনে হয় সভ্যতা। কী জানি, এখন শুনি এগুলির চরিতার্থতাই নাকি সভ্যতা। হায়, সভ্যতার সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। এখন পশ্চিমা দুনিয়া যা বলে তাই সভ্যতা কারণ তারা ধনী। দুর্ভাগ্য, আমরা সম্পদকে সভ্যতা মনে করি।

ভিডিয়োতে দেখেছি, আধো আধো বোল শিশুদের চোখ বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয়। চোখবাঁধার পরে মায়েরা জায়গা পাল্টে ওলটপালট হয়ে বসেন। পিচ্চিগুলো দৌড়ে আসে মায়েদের কাছে। ফুলের মতো দেখতে এই শিশুরা গালে গাল ঘষে, গন্ধ শুঁকে মাকে চিনে নেয়। কারুরই ভুল হয় না, শতভাগ অব্যর্থ। এ কাজে কি ওদের ফেরেশতারা সাহায্য করেন নাকি ওরাই ফেরেশতা, আমার কাছে আজও এ প্রশ্নটি অমীমাংসিত। 
‘খোকা বড় হয় না কাপড় ছোট হয়, 
পুরনো এ কথার মীমাংসা হয় না কোনোদিন।’

হযরত মুহম্মদের (দঃ) কাছে এসে এক ব্যক্তি জানতে চাইলেন, মা-বাবার মধ্যে আমি কাকে উত্তম সেবা দেবো?
: তোমার মাকে।
: তারপর কাকে?
: তোমার মাকে।
: তারপর কাকে?
: তোমার মাকে।
: তারপর কাকে?
: তোমার বাবাকে।
কারণ, আল্লাহ না করুক বাবা মারা গেলে এবং মা বেঁচে থাকলে বাচ্চাদের মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা নিরানব্বই ভাগ। কিন্তু মা মারা গেলে বাবা বেঁচে থাকলে বাচ্চাদের মানুষ না হওয়ার আশঙ্কা নিরানব্বই ভাগ। সন্তানের জন্য মা যা পারেন বাবা তা পারেন না। এটা চিরন্তন। ব্যতিক্রম আছে। তবে মনে রাখতে হবে, ব্যতিক্রম নিয়ম নয়। সন্তানের কথা ভেবে মা অকাতরে মিথ্যা বলতে পারেন, ‘আমার ক্ষিধে নেই।’ হাসিমুখে এমন চরম মিথ্যা মায়েরা বলেন কী করে, আমি ভাবি এবং বিস্মিত হই। মিথ্যাও এতো মধুর হয়! 

আমরা কথায় কথায় বলি, সন্তান মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন। কেন? মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় সন্তানের নাভিমূলে একটি নাড়ি সরাসরি জোড়ানো থাকে মায়ের জরায়ুর সাথে। এটা দিয়েই সন্তান প্রয়োজনীয় খাদ্য পায় মায়ের কাছ থেকে। জন্মের সময় এই নাড়িটি ছিঁড়েই তাকে খালাস করা হয়। মায়ের বুকে প্রথম যে দুধ আসে তা রক্তমেশানো, শালদুধ। শিশুর বেহেশতি খাবার। আমি মানবসভ্যতার শেষদিন পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গেলাম, মানুষ কোটি কোটি বছর সাধনা করলেও এর একফোঁটা দুধ বানাতে পারবে না। কলেজে আমার শ্রদ্ধেয় লজিকের শিক্ষক মুক্তি মজুমদার বলেছিলেন, ‘সন্তানের মুখ দেখেই মা বুঝে যান সে অভুক্ত কিনা। পৃথিবীতে সবকিছুর লজিক থাকলেও এটার যে কোনো লজিক নেই বাবা।'

একটি প্রচলিত সংলাপ আছে। বাবা সন্তানকে বললেন, ‘তুই এতো মা মা করিস কেন?’ সন্তান অম্লানবদনে বললো, ‘ওমা, এটা তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।’ হা হা হা, বাবা একেবারে ধরা, হাতেনাতে। 
গোপন সত্যটি হলো, পৃথিবীর সব বাবাই এ রকম ধরা খেয়ে বিমলানন্দ লাভ করেন।

একদা আমাকে এক তরুণ ইংরেজ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুই পার্থিব। একমাত্র শিশুর আনন্দিত হাসিটুকুই অপার্থিব, স্বর্গীয়।’ মনে হয় ভিনদেশি ওই তরুণ ইংরেজটি অতিশয়োক্তি করেন নি।

নজরুল তাঁর ‘শিশু যাদুকর’ কবিতায় বলেছেন,
‘পার হয়ে কতো নদী কতো যে সাগর
এই পারে এলি তুই শিশু যাদুকর।
- - - - - - - - - - - - - - - - -
বনে কি পড়িলো কম একটি কুসুম
ধরণীর কোলে এলি একরাশ চুম।’

মা-বাবার সবকিছু সন্তানকে জানতে নেই। একটু বড়ো হয়ে বোঝাই ভালো। থাক না কিছু গোপনীয়তা। আমরা সবকিছু জানিয়ে সন্তানকে যুধিষ্ঠির বানানোর জন্য বড়োই উতলা হয়ে পড়েছি। শিশুকে সবকিছু জানতে দেয়া মানে তাকে বখে যেতে সাহায্য করা। প্রয়োজনে অশ্বত্থামা হত জোরে বলুন, ইতি গজ আস্তে বলুন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জন্মকথা’ কবিতায় বলেছেন, 

খোকা মাকে শুধায় ডেকে--
     ‘এলেম আমি কোথা থেকে,
কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে?'
     মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
     খোকারে তার বুকে বেঁধে--
‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।’

প্রসঙ্গক্রমে বলি, সমকামিতা কোনো মানবাধিকার নয়, এটি একটি বিকৃতি। আর বিকৃতি আদৌ কোনো সভ্যতা নয়। আমাদের দৃঢ়ভাবে মনে রাখতে হবে, উন্নতি মানে পেছনে হাঁটা নয়, সামনে এগোনো। আমরা ভুলে যাই যে, পেছনে তাকানো আর পেছনে হাঁটা এক নয়।

শাস্ত্রমতে একজন আদর্শ স্ত্রীর পাঁচটি গুণ থাকতে হবে। তিনি হবেন: ভোজনে মাতৃ, কথনে ভগ্নি, সহনে কন্যা, চলনে বন্ধু এবং শয়নে বেশ্যা। যৌবনে শেখা, বিভাজনে ভুল হতে পারে। সুন্দরী অষ্টাদশীটি স্থূলকৌশলে নিতম্ব প্রদর্শনে মরিয়া কিন্তু গর্ভ-মাহাত্ম্য বর্ণনে পরাঙ্মুখ। গো-নিতম্ব খারাপ না। কশাই গোরু কেনেন নিতম্বে কী পরিমাণ মাংস হবে তা অনুমান করে। দুর্ভাগ্য, আধুনিকারা সবকিছু পাশে ঠেলে শেষগুণে গুণান্বিতা হতেই বেশি পছন্দ করেন। 

ইন্টারনেটের বদৌলতে আজকাল আমরা অষ্টপ্রহর দেখছি তথাকথিত সেলিব্রিটিদের নোংরা ভিডিয়ো। যা দেখছি তা ভদ্রসমাজে কহতব্য নয়। খুবই কষ্টের সাথে বলতে হচ্ছে, আমাদের মায়েরা আজকাল পণ্য হয়ে গেছেন। ব্যক্তিগত বিষয়ের অজুহাতে সবকিছুকে জায়েজ করা সমীচীন নয়। তাঁরা কোটি কোটি টাকা কামাই করছেন শরীর দেখিয়ে, মাতৃত্বের মাহাত্ম্য প্রদর্শন করে নয়। ছিঃ! দেশের প্রচলিত আইনে এটি বৈধ হলেও মূল্যবোধ বিচারে এটি অনৈতিক।

তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মেয়েরা মায়ের জাত। তাঁদেরও পিতামাতা আছেন। বিপথগামী হলে তাঁদের বুঝাতে হবে, শাসন করতে হবে। যে যা-ই বলুক, পৃথিবীর সবচে বড়ো পরিচয় মা হওয়ার সৌভাগ্য একটি মেয়ের আছে। কিন্তু ঝোঁকের মাথায়, রাগের বশে, হুজুগে মেতে এমন কাজ করা যাবে না যাতে পৃথিবী মাতৃশূন্য হয়ে যায়। 

আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, মাতৃক্রোড়ই হলো প্রকৃতপক্ষে মানবসভ্যতার সূতিকাগার, লালনকেন্দ্র॥

সম্পর্কিত খবর