সাইকেলে চেপে স্বদেশ জয়

  • শাহজাদা আল হাবীব
  • ২৬,জুন,২০২২ ১২:১৬ AM

"কোভিডের ছোবলে প্রায় একবছর ধরে গৃহবন্দি। এদিকে থর থর করে বয়ে যাচ্ছে সময়। বেড়ে যাচ্ছে বয়স। অথচ কত কিছুই না দেখা বাকি। কত শত গল্প শোনা বাকি যে এখনো। তাই গল্প কুড়াতে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি।" কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম সানি। অদেখাকে দেখার, অজানাকে জানার অদম্য আগ্রহ সেই শৈশব থেকেই। ভ্রমণের নেশা যেন মিশে আছে তার শিরায় শিরায়। ধরিত্রীকে নিজ চোখে অবলোকন না করে তিনি থামবেন না। প্রকৃতির বদান্যতা ও তার কোলে ভ্রমণই যেন বাঁচিয়ে রাখে তার জীবনীশক্তি। 

দুই চাকার পরিবেশবান্ধব যান বাইসাইকেল। সানি বাইসাইকেলে চড়ে দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বেড়িয়ে পড়েন। রাইডে তার সঙ্গী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র নাফিস নাঈম রাফি। রাইড শুরু করেন পঞ্চগড় থেকে এবং তার পরিসমাপ্তি ঘটে কক্সবাজারের মাটিতে পা স্পর্শ করার মাধ্যমে। জানুয়ারির ২৭ তারিখে শুরু হওয়া রাইড শেষ হয় ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে। দেশের সবগুলো জেলা সাইকেলে চড়ে ঘুরতে সময় লেগেছে মাত্র ২৭ দিন। রাইডের মোটো ছিল, #ReduceReuseRecycle। ধরিত্রী দু'হাত ভরে কৃপা দিয়ে যাচ্ছে। তবু মানুষ বুঝে না বুঝে দিন দিন পরিবেশ দূষণ করে আখেরে নিজেদেরই বিপদ ডেকে আনছে। ক্ষতিকর দ্রব্যের উৎপাদন হ্রাস ও বর্জ্যের পুনঃব্যবহারে -- মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই মোটো বেছে নেওয়া।

পথে পথে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গল্প। যেইসব গল্প তিনি দু'হাত ভরে কুড়িয়ে নিয়েছেন। সঞ্চয় করেছেন জীবনঝুলিতে। চলতে চলতে পথচারী, ভ্যানওয়ালা, চা বিক্রেতা; সবার জীবনের গল্প তিনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছেন। দু'চোখ ভরে দেখেছেন নয়াভিরাম গ্রাম-বাংলার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লহরী। সখ্যতা গড়ে উঠেছে রত্নাই, আত্রাই, সন্ধ্যা, সুগন্ধ্যা, চিত্রা, ভৈরব, পায়রা, নবগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর সঙ্গে। ৬৪ জেলা ভ্রমণ করছেন শোনার পর সাধারণ মানুষের সহোযোগিতা ও আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করেছে। তখন তাদের চোখে তাকিয়ে পড়েছেন বিষ্ময়মাখা স্নেহ। রাইডের দিচ্ছেন শুনে চায়ের বিল নিতে অস্বীকার জানিয়েছিলো একজন চা বিক্রেতা। তিনি চুয়াডাঙ্গার বিখ্যাত কলা না খাইয়ে ছাড়েননি! এ অকৃত্রিম ভালোবাসা কি ঘর ছেড়ে বের না হলে পেতেন?
 

শীতের সকালে 

দাউদকান্দির অদূরে মটরসাইকেলে চেপে আসা দুই ছিনতাইকারী নিয়ে যায় সাধের স্মার্টফোনটি। হয়তো অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনাটি সানি ভুলে যেতে চাইবেন। নিজ উপার্জনে কেনা প্রথম ফোন। সঙ্গতকারণে আবেগটা একটু বেশিই। তাছাড়া ফোনে সংরক্ষিত ছিলো ভ্রমণের নানা স্মৃতি, বিভিন্ন মানুষর সঙ্গে তোলা সেল্ফি এবং দর্শনীয় স্থানসমূহের প্রতিকৃতি। তবু তিনি মনে করেন, যা হারিয়েছেন তার চেয়ে ঢের পেয়েছেন মানুষের কাছ থেকে। প্রকৃতির মায়াময় আলিঙ্গন থেকে। সর্বোপরি ভ্রমণের অনুভূতি কেমন জানতে চাইলে বলেন, "অনেকটা বইমেলায় স্টলে দাঁড়িয়ে একটা বই উল্টে-পাল্টে দেখার মতো। সারমর্মে হালকা চোখ ভুলানো। অথচ বইয়ের পরতে পরতে হাজারো রহস্য-জীবন লুকিয়ে থাকে।"

শুরুতে কিছুটা ইতস্তত ভাব থাকলেও পরিবারই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। মা প্রতিদিনই অসংখ্যবার ফোন করে খবরাখবর নিয়েছেন। কখনো কখনো উদ্বিগ্ন হয়েছেন। মায়ের মন তো! তবু মায়ের আঁচলই ভরসার স্থল। এগিয়ে চলার প্রেরণা। অন্তিমদিনে মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই কক্সবাজারে আগে থেকেই তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সবার আগে অভিনন্দন জানাতে। পরিবারের স্নিগ্ধ ভালোবাসায় সানি বরাবরের মতোই আপ্লুত হয়েছেন।

বাইসাইকেলে চেপে সানির লং রাইড দেবার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে 'ক্রস কান্ট্রি' রাইড দিয়েছিলেন। সাইক্লিং নিয়ে সামনের ভাবনা কি জানতে চাইলে  বলেন, "দেশটা তো ঘুরা হলো। এবার বিশ্বটাও দু-চোখ ভরে দেখতে চাই। সামনে ভারত ঘুরে দেখবো। এরপরের লক্ষ্য পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক দেশসমূহ।"

সম্পর্কিত খবর

কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি