মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একমাত্র সরকারি হাসপাতালে নেই প্রয়োজনীয় জনবল। প্রয়োজনের তুলনায় সহায়ক কর্মীসহ সংখ্যায় কম বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। রয়েছে বিভিন্ন পদের কর্মচারী সংকট। উপজেলার প্রায় ৩ লাখ জনবসতির চিকিৎসা সেবার বড় ভরসা এ হাসপাতালটি। নানা সমস্যায় এটিই আজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ না থাকায় বিঘিœত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।
এতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ। চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার হলেও সে অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। জনবল নিয়োগ নেই দীর্ঘদিন ধরে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য মতে, হাসপাতালের ১২টি কনসালটেন্ট পদে এখনও শূন্য রয়েছে ৮টি। এর মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (চর্ম ও যৌন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলোজি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (নাক-কান), জুনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু), জুনিয়র কনসালটেন্ট (ফিজিক্যাল মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (বিষয়হীন) পদে শূন্য রয়েছে ৬টি, মেডিকেল অফিসার/সহকারী সার্জন পদে সাতজন থাকার কথা থাকলেও নেই একজনও,
ফাঁকা রয়েছে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এর পদটিও, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (এসআই) পদে শূন্য রয়েছে ১টি,মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (এস.আই) পদে শূন্য ১টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফী) পদে শূন্য ১টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাফি) পদে শূন ১টি, পরিসংখ্যানবিদ পদে শূন্য ১টি, হেলথ এডুকেটর পদে শূন্য ১টি, কম্পিউটার অপারেটর পদে শূন্য ১টি, কার্ডিওগ্রাফার পদে শূন্য ১টি, অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে শূন্য ১টি, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে শূন্য ৬টি, স্বাস্থ্য সহকারী পদে শূন্য ৭টি অফিস সহায়ক পদে শূন্য ২টি, ওয়ার্ড বয় পদে শূন্য ২টি, বাবুর্চি পদে শূন্য ১টি এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে ৩টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া উপজেলার হুগলিয়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার পদে শূন্য ১, ফার্মাসিস্ট ১, মিডওয়াইফ ১, দশরথ হুগলিয়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার পদে শূন্য ১, শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সহকারী সার্জন পদে শূন্য ১, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদে শূন্য ১,
মির্জাপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সহকারী সার্জন পদে শূন্য ১, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদে শূন্য ১, কালিঘাট ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সহকারী সার্জন পদে শূন্য ১, সাতগাঁও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সহকারী সার্জন পদে শূন্য ১, সিন্দুরখান ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সহকারী সার্জন পদে শূন্য ১, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদে শূন্য ১ এবং কালাপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সহকারী সার্জন পদে শূন্য রয়েছেন ১জন।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে রোগীদের দীর্ঘ লাইন, কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক। এতে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের সাইটুলা গ্রামের আক্তার বলেন, টিকিট কেটে ২ ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আরও কতক্ষণ সময় লাগবে, তা বলতে পারছি না। এভাবে গরমের মধ্যে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে এলে রোগ কমবে না, বাড়বে আরও। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রাজঘাট চা বাগানের সুকেন তাতী বলেন, আমার কোমরের ব্যথা। এ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নাই, তবু আসলাম। কারণ, বাইরে ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা নাই আমার। সরকারি হাসপাতলেই ভরসা গরিবের। অন্যান্য রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্খিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। চিকিৎসকের ঘাটতি মেটাতে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন।
শহরতলীর মুসলিমবাগ এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল হোসেন বলেন, আমার স্ত্রী অস্তঃসত্ত¡া। বিকেলে হাসপাতালে ভর্তি করে রাতে জানতে পারি এখানে গাইনি ডাক্তার নিয়মিত আসেন না। সপ্তাহে নির্ধারিত দুইদিন গাইনি ডাক্তার এখানে সিজারিয়ান অপারেশন করেন। আমরা গরিব মানুষ, প্রাইভেটে ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই। এরপরও বাধ্য হয়েই প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে ভর্তি করি।
একাধিক রোগীর স্বজন জানিয়েছেন, জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা ছাড়া সারাদিনে কোনো চিকিৎসক রোগীর কাছে যান না। সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে। জরুরি মুহূর্তে রোগীর চিকিৎসাসেবায় ডাক্তার পাওয়া যায় না। কিছু কিছু সময় সিনিয়র সেবিকারাও রোগীর কাছে যান না। একবারের বেশি ডাকলে তারা খুব রূঢ় আচরণ করেন। তারাও শিক্ষানবিশ সেবিকাদের দিয়ে কাজ সারেন। সরকারি জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক-সেবিকা যেন ফাঁকিবাজিতে ব্যস্ত। হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজন রোগী বলেন, শ্রীমঙ্গলের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপজেলার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেই বললে চলে। মাঝেমধ্যে নার্স এলেও চিকিৎসকের দেখা মেলে কম।
বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে থাকতে হয়। টয়লেটের অবস্থা আগের তুলনায় কিছুটা পরিস্কার হলেও থাকে না পানি/বদনা, অভাব রয়েছে পর্যাপ্ত টয়লেটেরও। হাসপাতালের একাধিক স্টাফ বলেন, হাসপাতালে সার্জন ও গাইনি চিকিৎসক নিয়মিত না থাকায় অন্তঃসত্ত¡া নারীরা এসে ঘুরে যান। এটা আমাদেরও খারাপ লাগে। চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা রোগীর তুলনায় কম হওয়ায় খুব চাপের মধ্যে আছি। এদিকে জরুরি বিভাগেও সেবা নিতে আসা রোগীরাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জানা গেছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরিবর্তে জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের প্রেসক্রিপশন লিখে সেবা দিচ্ছেন হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন, নার্সিং সুপারভাইজার ও স্যাকমোরা।
তাদের চিকিৎসা সেবা নিয়ে সচেনতন নাগরিকরা তুলেছেন নানা প্রশ্ন। মেডিকেল অফিসারের পদ ফাঁকা থাকায় মাঝেমধ্যে মেডিকেল অফিসারের দায়িত্বও পালন করছেন তারা। এতে সচেতন মহলে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ভুক্তভোগীরা বলেন, চিকিৎসকসহ অন্যান্য পদগুলো শূন্য থাকায় রোগীরা পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করতে হয়। অন্যদিকে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারকে দিয়ে হাসপাতালে ইমার্জেন্সি ডিউটি করানো এবং চিকিৎসক সংকটের কারণে উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেও ব্যাহত হচ্ছে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সিনথিয়া তাসমিন বলেন, ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রচুর চাপ যাচ্ছে। চিকিৎসক সংকট থাকায় সেবা দিতে ডাক্তার ও নার্সরা যেভাবে হিমশিম খাচ্ছেন তেমনি সাধারণ রোগীরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এভাবে একটা হাসপাতাল চালানো অনেক কষ্টের। এখানে জেনারেটর থাকলেও তেল বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছি। রোগীদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে চিকিৎসকসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও কেউ তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তদন্ত সাপেক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান বলেন, শুধু শ্রীমঙ্গল নয়, প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক-সংকট রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছি প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল বাড়ানোর জন্য। এই অল্প জনবল দিয়ে সেবা দেওয়া অনেক কঠিন। আশা করছি চলতি মাসে প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিছু চিকিৎসক দেওয়া হবে এবং ডিসেম্বরের আগেই জনবল চিকিৎসক ও জনবল সংকট দূর হবে।