Connect with us

দূর্নীতি

৯ গোপালের সিন্ডিকেটে ৫ কোটি লোপাট

| তদন্তের ভয়ে বদলির তদবির কর্মকর্তা – কর্মচারীদের

Published

on

| শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার ৯ গোপালের সিন্ডিকেট


হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে চলা হরিলুট, সীমাহীন অনিয়ম ও সিন্ডিকেটবাজির ঘটনার পর এখন প্রশাসনিক তদন্তের গুঞ্জনে চরম আতঙ্কে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিভিন্ন অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ, নাগরিক ক্ষোভ এবং বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক নাগরিকের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত, জবাবদিহিতা, শাস্তি ও বহিস্কারের সম্ভাবনায় অনেকেই বদলির জন্য শুরু করেছে জোর তদবির। কেউ কেউ আবার নবাগত প্রশাসককে কব্জায় নিতে শুরু করেছেন তেলবাজি। এতে পৌরসভায় চলছে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও টানাপোড়েন।

পৌরসভার একাধিক সূত্র জানায়, পৌর কর, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহনের লাইসেন্স, ভবনের নকশা অনুমোদন, জন্মনিবন্ধন ইস্যু-সংশোধন, ভূয়া ভাউচারে বিল উত্তোলন, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন খাতের ফি আদায়ে ব্যাপক অনিয়ম করে অন্তত ৫ কোটি টাকা লুপাট করেছে কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেট।

কালো বিড়ালের খপ্পরে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা


জানা যায়, দুটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মুলত হরিলুট হয়েছে পৌরসভার টাকা৷ যার একটির নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন কর নির্ধারক সুজিত কুমার দত্ত, লাইসেন্স পরিদর্শক সুশীল কুমার বসাক, কর আদায়কারী দেবাশীষ দেব ও সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল আলম জিসান ও মাস্টাররোলের কর্মচারী জিয়া উদ্দিন।


সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক মেয়র এম এফ আহমেদ অলির নিকটাত্মীয় কার্য-সহকারী নুরুল ইসলাম। তার সাথে রয়েছেন প্রধান সহকারী আতাউর রহমান, টিকাদান সহকারী কামাল উদ্দিন, অফিস সহায়ক নুরুজ মিয়া সহ কয়েকজন। সিন্ডিকেটটি মূলত এম এফ আহমেদ অলির এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দুই অর্থ বছরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণ করে মাত্র ২০ লক্ষ টাকা পৌর কর আদায় করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী যা ২ কোটি টাকা হওয়ার কথা। পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিনের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয় কয়েক লাখ টাকা। এছাড়াও কর নির্ধারক সুজিত কুমার উৎকোচের বিনিময়ে পৌর কর কমিয়ে দেন অন্যতায় মাত্রাতিরিক্ত কর ধার্য করে থাকেন। তার এই কাজে কর আদায়কারী দেবাশীষ দেব সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে লাইসেন্স পরিদর্শক সুশীল কুমার বসাক বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স দিতে মোটা অংকের ঘুষ আদায় করেন। লাইসেন্সবিহীন দোকানগুলো থেকে মাসোয়ারা আদায়ের মতো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বর্তমানে পৌরসভার এক তৃতীয়াংশ দোকানও ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আসেনি সুশীল বসাকের জন্য। এছাড়াও পৌরসভার অভ্যন্তরে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের জন্য মোটা অংকের ঘুষ দিতে হয় সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল আলম জিসানকে। চাহিদা মোতাবেক ঘুষ না দিলে নানান অজুহাতে আটকে রাখা হয় নকশার অনুমোদন। এছাড়াও যুবলীগ নেতা জিয়া উদ্দিন মাস্টার রোলে চাকরি করলেও সচিবের আস্থাভাজন হওয়ায় ভোগ করছেন বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা।


প্রধান সহকারী আতাউর রহমান যোগদানের পর থেকেই আছেন এখানে। শায়েস্তাগঞ্জ এলাকায় তার শ্বশুরবাড়ি হলেও পৌরসভার অর্থ নয়-ছয় করে তৈরি করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। কার্য-সহকারী নুরুল ইসলাম আরও এক ধাপ এগিয়ে, তিনি একাধারে পাঁচ বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও উত্তোলন করেছেন বেতন-ভাতা। সাবেক মেয়রের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো সিন্ডিকেট। হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। টিকাদান সুপারভাইজার কামাল উদ্দিন এর বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ, জন্মনিবন্ধন ইস্যু ও সংশোধনের ক্ষেত্রে ঘুষ বাণিজ্য, নাগরিক হয়রানি তার নিত্য নৈমিত্তিক কাজ। তার বিরুদ্ধে একাধিক বার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে এখনো রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে।

অনিয়ম করে করেছেন বিশাল সম্পত্তি, কিনেছেন ২টি সিএনজিও। এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তি দুদক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এছাড়াও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে পৌরবাসীর মাঝে। প্রকাশিত সংবাদ ও অভিযোগের বিষয়টি উদ্ধোধন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় একাধিক দপ্তর থেকে নেওয়া হচ্ছে তদন্তের প্রস্তুতি। এ নিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জবাবদিহি ও শাস্তির ভয়ে অন্যত্র বদলির জন্য চালিয়ে যাচ্ছেন তদবির।


এখন চলছে নথি ‘গায়েব’ করার অপচেষ্টা। যাতে তদন্তে লুকানো যায় অনিয়মের তথ্য। এ নিয়ে গুপ্ত আলোচনাও চলছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মচারী। তারা বলেন, “যারা সবচেয়ে বেশি অনিয়ম করেছে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে। বাঁচার উপায় না দেখে এখন সবার ‘ছেড়ে দে মা কেদে বাঁচি’ অবস্থা।”

এদিকে, সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে পৌরসভায় সেবার নামে হয়রানির পাশাপাশি হরিলুট হলেও এখনো দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা মনে করছেন, কঠোর তদন্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ হবে না। তাদের দাবি, “অনিয়মকারীদের বদলি নয়, শাস্তি নিশ্চিত হোক। নইলে হরিলুট আরও বেড়ে যাবে।”

অভিযোগের বিষয়ে কার্য-সহকারী নুরুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সালে সাবেক মেয়র মোঃ ছালেক মিয়া আমাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা দিয়ে সাময়িক বরখাস্ত করে রেখেছিল। আমি বকেয়া বেতন প্রায় তিন বছরের পাওনা আছি। আমি প্রতিহিংসার শিকার।


এ বিষয়ে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, আমি এবং প্রশাসকের কারণে পৌরসভার ২৮ বছরের দুর্নীতি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই আমরা দুর্নীতিবাজদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছি। কিছু কর্মচারী অনিয়ম করতে করতে চুড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। তারা অনিয়ম কে নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে। তারা পৌরসভাকে ব্যাক্তিগত প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমি ইতিমধ্যে বদলির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। ১৪২১-৩১ সাল পর্যন্ত হাট বাজার ইজারার কত টাকা কোষাগারে জমা হয়েছে সে বিষয়ে খোঁজ নেন, সব টাকা তারা আত্মসাৎ করেছে। বিগত ২০-২৫ বছরের তথ্য উদঘাটনে অনুসন্ধ্যান করুন। সব বেরিয়ে আসবে।

Exit mobile version