Connect with us

মতামত

দাঙ্গা নয় : ভ্রাতৃত্বে গড়ে উঠুক লাখাই

| মনর উদ্দিন মনির

Published

on

ছবি | মনর উদ্দিন মনির ( বাংলা মিরর)

আমার জন্ম লাখাইয়ে। এখানকার মাঠ, খাল, হাট-বাজার; সবই আমার শৈশবের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। এখনো মনে পড়ে, কী শান্ত ছিল এই এলাকা। ঈদের সময় চারপাশে ছিল খুশির আমেজ, গ্রামের বাড়িতে ফিরত প্রবাসীরা, ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পড়ে বাড়ি বাড়ি বেড়াত। অথচ এখন ঈদের নাম শুনলেই অনেকের মনে ভর করে ভয়। কারণ গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঈদ এলেই লাখাইয়ের কোথাও না কোথাও ঘটে যাচ্ছে ভয়াবহ সংঘর্ষ। যেন ঈদ মানেই দাঙ্গার মৌসুম। আর এসব ঘটনা শুধু সংবাদপত্রেই নয়; আমরা যারা লাখাইয়ে থাকি বা যাদের শিকড় এখানেই গাঁথা, তারা খুব ভালো করেই টের পাই। কোথায় জানি একটা অজানা অস্থিরতা জমে থাকে মানুষের চোখেমুখে। মনে হয়-কে কখন কার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটা অন্যতম কারণ থাকে- আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। একেক গ্রুপ চায়, এলাকার সর্দারি যেন তার দখলে থাকে। রাজনীতির নামে গোষ্ঠীভিত্তিক শত্রুতা তৈরি হয়। কে কাকে দমন করবে, কে কার চেয়ে বেশি প্রভাবশালী- এই প্রতিযোগিতার বলি হয় সাধারণ মানুষ। আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় যেসব নিরীহ মানুষ জড়িয়ে পড়ে, তাদের অনেকেই জানেই না, কেন তাদের বাড়িতে আগুন লাগলো, কেন তাদের ছেলেটাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। 

বিশেষ করে লাশকে পুঁজি করে শুরু হয় লুটপাট-ধ্বংসলীলা। আর এটা যেন-এক ধরণের নিয়মে পরিণত হয়ছে। যতবার লাখাই উপজেলায় ‘মার্ডার’ হয়েছে তার সবকটির একই চিত্র দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সবাই যে এসব মারামারিতে সম্পৃক্ত থাকে ব্যাপারটা এমনও নয়। তবুও কেবল মাত্র দল কিংবা গোষ্ঠির লোক হওয়ায় এ লুটপাট-ধ্বংসলীলা থেকে তারা রেহাই পায় না। 

এছাড়া এসব লুটপাট-ধ্বংসযজ্ঞে খুন হওয়া ভুক্তভোগীর পরিবারের দু’পয়সারও কোন পায়দা হয় না। মধ্যপথে কিছু নিম্নমানসিকতা অসৎ লোকরা পায়দা লুটে। এগুলো বন্ধে প্রশাসনের নানামুখী চেষ্টা থাকলেও বেলাশেষে দেখা যায়, গ্রামের এসব লুটপাট বাহিনীর সাথে পেরে উঠাটা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে থামালে অন্যদিকে ধ্বংসযজ্ঞে নেমে যায়।

এসব ঘটনার ফলে যখন একটা এলাকায় মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে না, ঈদের নাম শুনে আনন্দের বদলে আতঙ্ক অনুভব করে—তখন বোঝা যায়, সমাজের ভিত নড়ে গেছে। লাখাইয়ের অবস্থা এখন অনেকটা এমনই। শুধু দাঙ্গা নয়, দাঙ্গার পরের ক্ষতিটাও ভয়াবহ। প্রতিশোধপরায়ণতা বাড়ে, গ্রামের মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ছোটদের, বাজারে যান না মহিলারা। একটা দাঙ্গা গোটা গ্রামকে অচল করে দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের চিন্তা করতে হবে- আমরা কি লাখাইকে আবার সেই শান্তির জায়গায় ফিরিয়ে নিতে চাই? নাকি এই সংঘর্ষকেই ভবিষ্যতের রীতি বানিয়ে ফেলব? 

যদি বলি, প্রথমেই দরকার মানসিক পরিবর্তন। আমাদের বুঝতে হবে- গায়ের জোর দিয়ে নেতা হওয়া যায় না, মানুষকে ভালোবেসে পাশে পেলে তবেই প্রকৃত নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে যে লাভ হয় না, সেটা যারা বুঝে গেছে, তারা এবার এগিয়ে আসুক। মুরুব্বিরা, স্কুলশিক্ষকরা, প্রবাসী ভাইয়েরা- এলাকার হাল ধরতে হবে আমাদেরই। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা পৌঁছাতে হবে ঘরে ঘরে। 

প্রশাসনেরও এখন দায়িত্ব কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু সেই সাথে দরকার ন্যায়বিচার। যারা নিরীহ, তারা যেন হয়রানির শিকার না হন। বরং দোষীদের বিরুদ্ধে এমন বার্তা দিতে হবে- যাতে কেউ আর সাহস না পায় দাঙ্গা করতে। 

আমাদের মসজিদগুলো, মাদ্রাসা, স্কুল- এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করতে হবে সচেতনতামূলক কাজে। প্রতি শুক্রবার বা উৎসবের আগে যেন ইমাম সাহেব শান্তির কথা বলেন। শিক্ষকরা যেন সহিংসতার বদলে ভালোবাসা শেখান।

সবশেষে বলি, লাখাই আমাদের, একে নষ্ট করে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এই সহিংসতা বন্ধ না হলে লাখাইয়ের সন্তানরা আর গর্ব করে বলতে পারবে না- ‘আমি লাখাইয়ের লোক।’ এটা আমাদের চূড়ান্ত ক্ষতি। 

সবশেষে বলবো, ব্যক্তিগত গর্ব-অহংকার ছেড়ে, হাত বাড়িয়ে দিই একে অন্যের দিকে। শান্তিপূর্ণ লাখাই গড়তে এগিয়ে আসি সবাই মিলে। লাখাই হোক ভালোবাসার জায়গা, দাঙ্গা নয়- সম্প্রীতির নাম হোক লাখাই।

Exit mobile version