Connect with us

সম্পাদকীয়

জাহেলিয়াত যায় না, শুধু পোশাক বদলায়

| নুর হোসেন সোহেল

Published

on

ছবি | নুর হোসেন সোহেল

এ সমাজে বাঁচতে চাইলে কত চাঁদা দিতে হবে? মাসে না বছরে? পাঁচ বছরের জন্য দাম কত? দশ বা পনেরো বছরের নিরাপত্তার প্যাকেজ কতো টাকায় পাওয়া যায়? আজ সাধারণ মানুষ এমন প্রশ্ন করছে। কারণ প্রশ্ন করার মতো বাস্তবতা তৈরিই করে দিচ্ছে এই অবক্ষয়।

বাংলাদেশে এখন আর একটি ঘটনা আমাদের নাড়িয়ে দেয় না—কারণ একই ধরনের অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে নির্যাতন—সবকিছু যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবুও, সম্প্রতি পাথর দিয়ে পিটিয়ে এক নিরীহ ব্যবসায়ীকে হত্যা করার ঘটনাটি মানুষকে চমকে দিয়েছে। কারণ এটি শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের মৃত্যু।

এই কি সেই বাংলাদেশ, যার স্বপ্ন আমরা দেখতাম? যেখানে সকালবেলা দোকান খুলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা এখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান? যেখানে শিশুদের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পিতার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নিয়েই উদ্বিগ্ন মা?

আজ প্রশ্ন জাগে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কি শুধুই ভাগ্যের উপর নির্ভর করবে? একজন রাজনৈতিক কর্মীর চোখে পড়ে গেলে, বা তার দাবিকৃত চাঁদা না দিলে, কি এমনই নির্মম পরিণতির শিকার হতে হবে? রাষ্ট্র কি আজ অসহায়, না কি ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রেখেছে?

সাম্প্রতিক ঘটনা গুলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এক ধরনের ‘মাফিয়া সংস্কৃতি’র ইঙ্গিত দেয়। যারা চাঁদা দেয় না, তারা শাস্তি পায়। যারা প্রশ্ন তোলে, তারা গুম হয়। আর যারা মুখ বন্ধ রাখে, তারা কাঁপতে কাঁপতে বেঁচে থাকে। তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

জনগণ এখন রাজনৈতিক নেতাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছে—“আমরা কি নিরাপদ? যদি নিরাপদে বাঁচতে চাই, তাহলে কোন রেটে কত চাঁদা আপনাদের দিতে হবে?” এই প্রশ্ন নীতিহীনতা আর বিশ্বাসঘাতকতার এক নিঃসঙ্গ দলিল।

রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আজ এই মৌলিক দায়িত্ব যখন ব্যবসা-বাণিজ্যে রূপ নিচ্ছে, তখন রাষ্ট্র কেবল একটা কাঠামো মাত্র—যা ধ্বসে পড়ছে ধীরে ধীরে।

আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? যেখানে বিচার নয়, শক্তিই শেষ কথা?
আমরা কি এমন রাজনীতি চেয়েছিলাম? যেখানে নেতৃত্ব নয়, লুণ্ঠনই লক্ষ্য?

এই অবস্থা বদলাতে হলে আমাদের চাই এক জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও সাহসী রাষ্ট্র। চাই এমন রাজনীতি, যেটি জনগণের সেবক, শাসক নয়। এবং চাই এমন সমাজ, যেখানে একজন মানুষ কেবল মানুষ হওয়ার পরিচয়ে বাঁচতে পারে, চাঁদা না দিয়েও।

জাহেলিয়াত নিজে নিজে যায় না। তাকে তাড়াতে হয়। যুগে যুগে মানুষ তাড়ায় আবার ফিরে আসে আবার বিক্ষুব্ধ জনতা এক জোট হয়। এভাবে তো চলছে।

আমরা ইতিহাসে বারবার দেখেছি—জাহেলিয়াত যায়, আবার ফিরে আসে। পোশাক বদলায়, নাম বদলায়, রূপ বদলায়; কিন্তু তার নিষ্ঠুরতা থেকে মানুষের মুক্তি মেলে না।
মানুষ বারবার আশায় বুক বাঁধে, প্রতিশ্রুতির মুখে আস্থা রাখে। কিন্তু প্রতিবারই প্রতারণা হয়, প্রতিবারই নিপীড়নের নতুন অধ্যায় লেখা হয়।

জাহেলিয়াত যায়, জাহেলিয়াত আসে—কিন্তু মানুষের মুক্তি মিলে না।

লেখক ও বিশ্লেষক: নুর হোসেন সোহেল। পিএইচ-ডি গবেষক, যুক্তরাজ্য।

Exit mobile version