একটি ভোক্তা সচেতনতা কর্মসূচিতে দেখেছিলাম। সেখানে শিখলাম কিভাবে পণ্যের মোড়ক দেখে আসল চিনতে হয়। আজ সকালে খবরের কাগজ খুলতেই চোখে পড়ল নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের খবর। হঠাৎই মনে হলো – এই তো! রাজনীতির বাজারে এখন যে পণ্য চলছে, তার জন্য তো এমন সচেতনতারই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন!
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ এখন একটি বিশাল সুপার শপের মতো। প্রতি সপ্তাহেই নতুন নতুন “ব্র্যান্ড” আসছে বাজারে। চকচকে প্যাকেজিং, আকর্ষণীয় স্লোগান, মিষ্টি মিষ্টি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভেতরে কী আছে? খুলে দেখলে প্রায়ই পাওয়া যায় সেই পুরনো, বাসি, কখনো কখনো ক্ষতিকর পণ্য!
এখনকার রাজনৈতিক বাজারে প্রধানত তিন ধরনের “পণ্য” দেখা যায়:
১. রিব্র্যান্ডেড প্রোডাক্টস: যারা গত বছর পর্যন্ত অন্য দলে থেকে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন, তারাই আজ নতুন লেবেলে। নাম পাল্টেছে, পতাকা পাল্টেছে, কিন্তু নীতির বাক্সে সেই পুরনো মালই।
২. কাউন্টারফিট গুডস: দেখতে আসল দলের মতো, কিন্তু কাজে সম্পূর্ণ ফাঁকি। এদের এজেন্ডা শুধু ক্ষমতার অংশীদারি নিশ্চিত করা।
৩. এক্সপায়ার্ড প্রোডাক্টস: যারা এক সময়ে কিছু বলেছিল, কিন্তু এখন শুধু নামটাই টিকে আছে। নতুন প্যাকেটে পুরনো ভাবধারা।
একজন বাজার বিশেষজ্ঞের ভাষায় বলতে গেলে, “এখন রাজনীতির বাজারে আসল-নকল চেনার একমাত্র উপায় হলো ‘জিএসটি স্ক্যান’ – গতকাল কি করছিলেন, সত্যি কথা বলবেন কি না, টাকা কোথা থেকে এলো!”
গণতন্ত্রের এই সুপার মার্কেটে ভোক্তা হিসেবে আমাদের কি কোনো সুরক্ষা আছে? নির্বাচন কমিশন কি এই “পণ্য”গুলোর জন্য কোনো ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ করতে পারছে? মিডিয়া কি আসলেই ‘পণ্য পরীক্ষা’ করে দেখছে? নাকি আমরা সবাই মিলে এই ভেজাল মার্কেটের সহযোগী হয়ে গেছি?
অবাক করা আমাদের এই গণতন্ত্র! যেখানে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরাও নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে মানুষের চোখে স্বপ্ন দেখায়—আশার বাণী শোনায় ভবিষ্যতের!
বাংলাদেশে রাজনীতি অনেকের জন্য একটি আদর্শ সেবার ক্ষেত্র না হয়ে বরং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের একটি সুবিধাজনক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রাজনীতিবিদরা যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন তারা দেশেই অবস্থান করেন এবং সেই সুযোগে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। আর যখন ক্ষমতা হাতছাড়া হয়, তখন তারা সেই অর্জিত সম্পদ নিয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। ফলে, ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই অনেক সময় জনগণের সেবার জন্য নয়, বরং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই হয়। এই প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
একটা সময় ছিল যখন রাজনৈতিক দল মানে ছিল আদর্শের ঘর। আজ তা পরিণত হয়েছে পেশাদারি বিপণন কৌশলের আখড়ায়। যার টাকা আছে, সে-ই এখন নিজের “ব্র্যান্ড” চালু করতে পারে। ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এখন প্রয়োজন শুধু ভালো এড এজেন্সি আর মিডিয়া কভারেজ!
একজন পল্টনের চায়ের দোকানের মালিক মজা করে বলেছিলেন, “স্যার, আগে নেতারা আসতেন আমাদের চায়ের দোকানে বসে জনগণের কথা শুনতে। এখন তারা আসেন শুধু প্রেস কনফারেন্স করতে। সেটাও যদি স্টুডিওতে হয়!”
কিন্তু আশার কথা হলো, বাজারে কিছু “অরগ্যানিক প্রোডাক্ট”ও আছে। যারা সত্যিকারের পরিবর্তন চায়, যাদের নীতির বাক্সে আছে সততা, স্বচ্ছতা আর দেশপ্রেমের উপাদান। সমস্যা হলো, এই ভালো পণ্যগুলো অনেক সময় বাজারের চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
৫ আগস্টের পর আমরা যে নতুন রাজনৈতিক বাজার দেখছি, তাতে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে দরকার:
১. ভোক্তা সচেতনতা: প্রতিটি রাজনৈতিক “পণ্য”কে গভীরভাবে যাচাই করা
২. কোয়ালিটি কন্ট্রোল: দলগুলোর জন্য কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ
৩. ওয়্যারেন্টি সিস্টেম: জবাবদিহিতার কার্যকর ব্যবস্থা
একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। এক ব্যবসায়ী তার দোকানে নকল মধু বিক্রি করত। একদিন এক বুদ্ধিমান ক্রেতা জিজ্ঞাসা করল, “এই মধু কি খাঁটি?” ব্যবসায়ী উত্তর দিল, “স্যার, আমার দাদাও এই একই প্রশ্নের একই উত্তর দিতেন – ‘আপনি বিশ্বাস না করুন, নিজে টেস্ট করুন!'”
আমাদের রাজনৈতিক বাজারেও কি একই অবস্থা? নতুন নাম, নতুন পতাকা, নতুন প্রতিশ্রুতি – কিন্তু আসল পরীক্ষা তো আমাদেরই করতে হবে!