সম্পাদকীয়
নতুন বাংলাদেশ : সম্ভাবনা না শঙ্কা?
নুর হোসেন সোহেল
Published
1 year agoon
By
Editorial
৫ই আগস্ট, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন বাঁকবদলের সূচনা হয়। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে দেশ প্রবেশ করে এক অনিশ্চিত অন্তর্বর্তী পর্বে। একদিকে বহু প্রত্যাশিত পরিবর্তনের সম্ভাবনা, অন্যদিকে নানা প্রশ্ন ও দ্বিধার জন্ম দেওয়া এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ভার বহন করছে। তবে এই সরকার নিয়ে জনমনে যেমন আশার সঞ্চার হয়েছিল, তেমনি সময়ের ব্যবধানে সেই আশার জায়গায় ধীরে ধীরে শঙ্কার ছায়া ঘনিয়ে আসছে।
প্রথমদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশা প্রবল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আস্থা অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা এবং বিতর্কিত কার্যকলাপ জনমনে একধরনের হতাশা সৃষ্টি করেছে। যখন বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার নামে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে মানুষ রাস্তায় নামে এবং সরকারের কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই সরকার আসলে কতটা প্রস্তুত একটি জটিল ও বহুমাত্রিক দেশ পরিচালনার জন্য?
এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর হঠাৎ আবির্ভাব দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব দলের অনেকেই অতীতে প্রত্যাখ্যাত, বহিষ্কৃত কিংবা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তাদের রাজনীতিতে পুনঃপ্রবেশ জাতির জন্য মোটেই সুখকর বার্তা বহন করে না। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণ একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ছাত্র আন্দোলন, বৈষম্য বিরোধী সংগঠন ও নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ নিজেদেরকে ফ্যাসিবাদ সরকারের পতনের মূল শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোটও এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব নিজেদের ঘাড়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। এর বিপরীতে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, এক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, বর্তমানে অনেকটাই কোণঠাসা। দলের শীর্ষ নেতারা হয়তো বিদেশে, কিন্তু তৃণমূলের অসংখ্য কর্মী এখনও মাঠে সক্রিয় রয়েছে—গ্রামে, গঞ্জে, অলিতে-গলিতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই কর্মীরা কি দলে থাকবেন, নাকি নতুন কোনো জোটে যোগ দেবেন? নাকি সময়ের অপেক্ষায় থাকবেন, সুযোগ বুঝে রাজপথে ফের সক্রিয় হওয়ার?
রাজনৈতিক মঞ্চে এখন দুটি পরস্পরবিরোধী মত প্রবল হয়ে উঠেছে। এক পক্ষ দ্রুত নির্বাচন চায়—তাদের বিশ্বাস, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক পথেই ফিরতে হবে। অপর পক্ষ বলছে, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জুলাই মাসের ভয়াবহ গণহত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন অর্থহীন। এই মতবিরোধের সুযোগে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের দিকে টানার এক নিষ্ঠুর ও কৌশলী খেলা চলছে। ফলে নির্বাচন আদৌ সময়মতো হবে কি না, সে নিয়েও জনমনে এক গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই ঘোষণা করেছিল, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—বাংলাদেশ কি সম্ভাবনার পথে এগোচ্ছে, না কি ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে? বর্তমান সরকারপ্রধান ড. ইউনুস একজন নীতিবান ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব হলেও, বাস্তবতা হচ্ছে, একা তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে একটি গোটা জাতির রাজনৈতিক জট খুলে ফেলা সম্ভব নয়।
তবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন জাতির মনে ঘুরপাক খাচ্ছে—তারা কি সত্যিই পারবে জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে? তারা কি পারবে বিগত দিনের লুণ্ঠিত, পাচার হওয়া জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনতে? তারা কি পারবে এমন একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করতে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নির্ভয়ে তাদের মত প্রকাশ করতে পারবে? এসব প্রশ্ন ঘিরে জনমনে স্পষ্ট দ্বিধা, শঙ্কা এবং আশঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো বিচার, অর্থ পুনরুদ্ধার কিংবা একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ দেখতে পাওয়া যায়নি। তাই সন্দেহ জাগাটাই এখন স্বাভাবিক—তারা আদৌ পারবে তো দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে?
এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একটাই—দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, স্বচ্ছ কার্যক্রম এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কেবল সরকার নয়, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি টেকসই ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র গড়ার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। অতীতের বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে, এবার প্রয়োজন একটি নতুন ঐক্য, নতুন দিক এবং নতুন প্রত্যয়ের।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, এই জাতি অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এই সংকটকালীন অবস্থাও অতিক্রম করা সম্ভব, যদি আমাদের মাঝে থাকে সাহস, বিচক্ষণতা ও ঐক্য। ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারে—তবে এই অনিশ্চয়তার গাঢ় ছায়া কেটে, বাংলাদেশ সম্ভাবনার নতুন সূর্য দেখবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশ আগামী দিনগুলোতে কী পাবে? সম্ভাবনা না শঙ্কা?
নির্ভর করছে আমাদের সিদ্ধান্ত, দায়িত্ববোধ, এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক পরিপক্বতার উপর।
লেখক ও বিশ্লেষক: নুর হোসেন সোহেল
পিএইচ-ডি গবেষক, যুক্তরাজ্য।
You may like
বাবা ও প্রেমিকের সহায়তায় পর্নোগ্রাফি তৈরি করতেন সুমাইয়া
হবিগঞ্জে ২১ঘন্টা পর মুচলেকায় মুক্ত বৈছাআ নেতা মাহদী হাসান
শব্দকথা সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের নতুন কমিটি ঘোষণা
পরিত্যক্ত ভবন থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার
মাদক বিক্রেতাকে ছাড়িয়ে নিতে গ্রামবাসীর উপরে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে হামলা
মাদক বিক্রেতাকে ছাড়িয়ে নিতে গ্রামবাসীর উপরে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে হামলা
অফিসে অনুপস্থিত, খামার ‘ভিজিট’ ১,৫০০ টাকা
বাবা ও প্রেমিকের সহায়তায় পর্নোগ্রাফি তৈরি করতেন সুমাইয়া
১১ জনের নাম উল্লেখ করে এনসিপির মামলা
মাজারে-ওরসে গান গাইতেন পেহেলি ভৈরবী, জীবনের শেষ গান গাইলেন সিলেটের মাজারে
বাবা ও প্রেমিকের সহায়তায় পর্নোগ্রাফি তৈরি করতেন সুমাইয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও বিক্রির অভিযোগে রাজধানী থেকে সুমাইয়া সাঈদ (২৫) নামে এক ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সারকে গ্রেপ্তার করেছে...
হবিগঞ্জে ২১ঘন্টা পর মুচলেকায় মুক্ত বৈছাআ নেতা মাহদী হাসান
হবিগঞ্জ সদর থানায় আটকের দীর্ঘ ২১ ঘন্টা পর মুক্তি পেয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব মাহদী হাসান।...
শব্দকথা সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের নতুন কমিটি ঘোষণা
| সভাপতি মনসুর, সম্পাদক জামান
পরিত্যক্ত ভবন থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার
| মাধবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের
মাদক বিক্রেতাকে ছাড়িয়ে নিতে গ্রামবাসীর উপরে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে হামলা
সুজাতপুরে মাদক কারবারি ভাতিজা কে রক্ষা করতে ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি মজলিসেরর নেতৃত্বে গ্রামবাসীর ওপর হামলার অভিযোগ বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরে ইয়াবাসহ...
অফিসে অনুপস্থিত, খামার ‘ভিজিট’ ১,৫০০ টাকা
| কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের।
হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা। প্রায় ২০ দিন ধরে কম চাপের পর বুধবার থেকে...
বিয়ে করতে চায় না প্রেমিক, বিষের বোতল হাতে তরুণীর অনশন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে পাঁচ দিন ধরে অবস্থান করছেন লায়লা নামে এক তরুণী। এ সময় তিনি সঙ্গে বিষের...
শায়েস্তাগঞ্জে ভোক্তা অধিকার অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় অভিযান চালিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার...
ভাঙাচোরা সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক এখন মৃত্যুফাঁদ
রোববার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের মাধবপুরে তেলবাহী লরি, বালুবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। এরআগে গত শুক্রবার এই...