Connect with us

সম্পাদকীয়

বিদেশমুখী উচ্চশিক্ষা: আস্থাহীনতার এক প্রতিচ্ছবি

নুর হোসেন সোহেল

Published

on

ছবি | নুর হোসেন সোহেল (বাংলা মিরর)

“লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”—এখন আর কেবল পড়ালেখা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। দেশে শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের বাস্তবতা, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জটিল সমীকরণে শিক্ষার্থীরা আজ প্রশ্ন করে—এই দেশে থেকে কী আদৌ ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব?

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন এবং মালয়েশিয়া—এই দেশগুলো এখন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য।

কিন্তু কেন এই অভিবাসনের প্রবণতা এত বাড়ছে?

প্রথমত, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ, সেশনজট এখনো বাস্তবতা, আর পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী নয়। ফলাফল—একটি ডিগ্রি অর্জনের পরেও চাকরি পাওয়া অনিশ্চিত।

এই অনিশ্চয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো চাকরি পেতে “যোগ্যতা” নয় বরং “সুপারিশ” বেশি কার্যকর। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দেখা যায়—ভালো ফলাফল ও স্কিল থাকার পরও চাকরি পাচ্ছেন না শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাবান পরিচিতি না থাকার কারণে। এই অবস্থায় তরুণরা যখন দেখতে পায়, দেশের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে তাদের কোনও ভরসা নেই, তখন তারা বিদেশকে বেছে নিচ্ছে একটি “বিকল্প স্বপ্ন” হিসেবে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার চেয়ে রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগ থেকে ক্যাম্পাস প্রশাসন পর্যন্ত দলীয় দখলদারিত্ব বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার প্রতীক।

ফলে অনেকেই কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং স্থায়ীভাবে বিদেশে সেটেল হওয়ার উদ্দেশ্যেই উচ্চশিক্ষার প্যাকেজ নিচ্ছেন। দেখা যায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার শেষে অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর দেশে ফিরতে চান না। কারণ দেশে ফিরে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, সুপারিশনির্ভর, অনিশ্চিত একটি ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে চান না।

এখানে সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। এখনো বিদেশে পড়তে যাওয়া একটি মর্যাদার প্রতীক, “ছেলে বা মেয়ে বিদেশে”—এই পরিচয় সামাজিক স্ট্যাটাসে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা যেন একপ্রকার ‘পাসপোর্ট টু সেটেলমেন্ট’-এ রূপ নিচ্ছে।

তবে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা সম্ভব, যদি আমরা শিক্ষাকে শুধুমাত্র সার্টিফিকেটভিত্তিক না রেখে দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসি। প্রয়োজন:

স্বচ্ছ ও দলনিরপেক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা,

যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম,

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি,

কর্মসংস্থানের সঙ্গে একাডেমিয়ার সেতুবন্ধন তৈরি করা,

ছাত্র রাজনীতিকে শিক্ষাবান্ধব করার উদ্যোগ।

সরকার চাইলে উচ্চশিক্ষার এই “ব্রেইন ড্রেইন” পরিস্থিতিকে “ব্রেইন গেইনে” রূপান্তর করতে পারে। নীতিগতভাবে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে দেশে ফেরাতে উৎসাহিত করা এবং তাদের মেধা দেশের জন্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাটাই এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড, তবে সেই মেরুদণ্ড আজ দুর্বল ও ভঙ্গুর। আমরা যদি চাহিদাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিদেশমুখিতা রোধ নয়, বরং “দেশবিমুখতা” আমাদের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করবে।


লেখক ও বিশ্লেষক: নুর হোসেন সোহেল।পিএইচ-ডি গবেষক, যুক্তরাজ্য।

জাতীয়6 days ago

হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের নয়া কমিটিশোয়েব সভাপতি, সেলিম সম্পাদক

হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি দৈনিক দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধি শোয়েব চৌধুরীকে সভাপতি ও স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ...

জাতীয়7 days ago

সশস্ত্র বাহিনী ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ দেশকে পরাস্ত করতে পারবে না: প্রধানমন্ত্রী

সশস্ত্র বাহিনী যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তবে বাংলাদেশকে কখনো কেউ পরাস্ত করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ...

জাতীয়7 days ago

সিলেটে চালু হলো ‘কৃষকের হাট’, কম দামে মিলবে পণ্য

সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ভাঙতে দেশে প্রথমবারের মতো সরকারি ব্যবস্থাপনায় সিলেটে চালু হলো ‘কৃষকের হাট’। জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উদ্যোগে...

জাতীয়1 week ago

মাধবপুরে ফুটপাত দখল করে রমরমা বাণিজ্য: জনদুর্ভোগ চরমে, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

​মাধবপুর পৌরসভার জনবহুল বাসস্ট্যান্ড এলাকার প্রধান বাজারে প্রবেশের একমাত্র ফুটপাতটি এখন প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী মহলের দখলে। সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ...

দূর্নীতি2 weeks ago

বন কর্মকর্তা তোফায়েলের রামরাজত্ব

| সাবেক উপদেষ্টার আত্মীয় পরিচয়ে

জাতীয়2 weeks ago

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কলিমনগর এলাকার ত্রাস,জলফু, আক্কাছ ও ইউনুসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী।

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কলিমনগর এলাকায় জলফু মিয়া, আক্কাছ মিয়া ও ইউনুস আলী নামের তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের...

জাতীয়2 weeks ago

মন্ত্রী আসবেন, তাই জোড়াতালি দিয়ে রাস্তার সংস্কার চলছে

ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস উপলক্ষে আগামীকাল শনিবার (৩ এপ্রিল) হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে একাধিক মন্ত্রীর সম্ভাব্য আগমন ঘিরে চলছে...

জাতীয়2 weeks ago

দুই নারী এমপিকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের বিচার চাইলেন রুমিন ফারহানা

দুই নারী সংসদ সদস্যকে নিয়ে একজন পুরুষ এমপির (আমির হামজা) ওয়াজ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিচার চেয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ...

জাতীয়2 weeks ago

এলপিজির সরকারি দাম ১৭০০, বিক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে ১৯০০তে

এপ্রিল মাসের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপি গ্যাসের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে বাজারে এই...

জাতীয়2 weeks ago

বাহুবলে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের ছাদে অবৈধ স্থাপনা, প্রশাসনের ৭ দিনের আল্টিমেটাম

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার হামিদনগর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত সরকারি কমপ্লেক্স ভবনের ছাদে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের...

Exit mobile version