সম্পাদকীয়
বিদেশমুখী উচ্চশিক্ষা: আস্থাহীনতার এক প্রতিচ্ছবি
নুর হোসেন সোহেল
Published
10 months agoon
By
Editorial
“লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”—এখন আর কেবল পড়ালেখা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। দেশে শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের বাস্তবতা, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জটিল সমীকরণে শিক্ষার্থীরা আজ প্রশ্ন করে—এই দেশে থেকে কী আদৌ ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব?
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন এবং মালয়েশিয়া—এই দেশগুলো এখন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য।
কিন্তু কেন এই অভিবাসনের প্রবণতা এত বাড়ছে?
প্রথমত, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ, সেশনজট এখনো বাস্তবতা, আর পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী নয়। ফলাফল—একটি ডিগ্রি অর্জনের পরেও চাকরি পাওয়া অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো চাকরি পেতে “যোগ্যতা” নয় বরং “সুপারিশ” বেশি কার্যকর। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দেখা যায়—ভালো ফলাফল ও স্কিল থাকার পরও চাকরি পাচ্ছেন না শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাবান পরিচিতি না থাকার কারণে। এই অবস্থায় তরুণরা যখন দেখতে পায়, দেশের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে তাদের কোনও ভরসা নেই, তখন তারা বিদেশকে বেছে নিচ্ছে একটি “বিকল্প স্বপ্ন” হিসেবে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার চেয়ে রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগ থেকে ক্যাম্পাস প্রশাসন পর্যন্ত দলীয় দখলদারিত্ব বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার প্রতীক।
ফলে অনেকেই কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং স্থায়ীভাবে বিদেশে সেটেল হওয়ার উদ্দেশ্যেই উচ্চশিক্ষার প্যাকেজ নিচ্ছেন। দেখা যায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার শেষে অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর দেশে ফিরতে চান না। কারণ দেশে ফিরে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, সুপারিশনির্ভর, অনিশ্চিত একটি ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে চান না।
এখানে সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। এখনো বিদেশে পড়তে যাওয়া একটি মর্যাদার প্রতীক, “ছেলে বা মেয়ে বিদেশে”—এই পরিচয় সামাজিক স্ট্যাটাসে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা যেন একপ্রকার ‘পাসপোর্ট টু সেটেলমেন্ট’-এ রূপ নিচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা সম্ভব, যদি আমরা শিক্ষাকে শুধুমাত্র সার্টিফিকেটভিত্তিক না রেখে দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসি। প্রয়োজন:
স্বচ্ছ ও দলনিরপেক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা,
যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম,
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি,
কর্মসংস্থানের সঙ্গে একাডেমিয়ার সেতুবন্ধন তৈরি করা,
ছাত্র রাজনীতিকে শিক্ষাবান্ধব করার উদ্যোগ।
সরকার চাইলে উচ্চশিক্ষার এই “ব্রেইন ড্রেইন” পরিস্থিতিকে “ব্রেইন গেইনে” রূপান্তর করতে পারে। নীতিগতভাবে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে দেশে ফেরাতে উৎসাহিত করা এবং তাদের মেধা দেশের জন্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাটাই এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড, তবে সেই মেরুদণ্ড আজ দুর্বল ও ভঙ্গুর। আমরা যদি চাহিদাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিদেশমুখিতা রোধ নয়, বরং “দেশবিমুখতা” আমাদের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করবে।
লেখক ও বিশ্লেষক: নুর হোসেন সোহেল।পিএইচ-ডি গবেষক, যুক্তরাজ্য।
You may like
শায়েস্তাগঞ্জে সড়কে চাঁদাবাজির মূলহোতা ইয়াসিন খান ধরাছোঁয়ার বাহিরে
বাহুবলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেল মাদ্রাসা ছাত্রের প্রাণ
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে একই পরিবারের ৩ জন নিহত
বাহুবলে চাঞ্চল্যকর গৃহবধু নাজমা হত্যা মামলার আসামী আব্দুল গনি গ্রেফতার
পেশায় সিকিউরিটি গার্ড, বন কর্মকর্তা পরিচয়ে করেন ‘চাঁদাবাজি’
বাহুবলে চাঞ্চল্যকর গৃহবধু নাজমা হত্যা মামলার আসামী আব্দুল গনি গ্রেফতার
জামালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ: ছাত্রী হোস্টেলে বালতি ভর্তি কনডম, হল সুপারসহ দু’জনকে অব্যাহতি
শায়েস্তাগঞ্জে সড়কে চাঁদাবাজির মূলহোতা ইয়াসিন খান ধরাছোঁয়ার বাহিরে
প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার অভিযোগে ২ তরুণী গ্রেপ্তার
পেশায় সিকিউরিটি গার্ড, বন কর্মকর্তা পরিচয়ে করেন ‘চাঁদাবাজি’
শায়েস্তাগঞ্জে সড়কে চাঁদাবাজির মূলহোতা ইয়াসিন খান ধরাছোঁয়ার বাহিরে
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় টোলের নামে চলন্ত গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আফিল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু ধরাছোঁয়ার...
বাহুবলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেল মাদ্রাসা ছাত্রের প্রাণ
বাহুবল উপজেলার কটিয়াদি- নন্দনপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেল মোঃ মাহদী (৫) নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রের নাম। সে উপজেলার লামাতাসি...
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে একই পরিবারের ৩ জন নিহত
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাকের ধাক্কায় শিশুসহ একই পরিবারের তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ) সকালে লালমনিরহাটের...
বাহুবলে চাঞ্চল্যকর গৃহবধু নাজমা হত্যা মামলার আসামী আব্দুল গনি গ্রেফতার
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কাজীহাটা গ্রামে চাঞ্চল্যকর গৃহবধু নাজমা আক্তার হত্যা মামলায় আব্দুল গনি (৪০) নামে এক আসামীকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই...
পেশায় সিকিউরিটি গার্ড, বন কর্মকর্তা পরিচয়ে করেন ‘চাঁদাবাজি’
কখনো র্যাব কর্মকর্তা, কখনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ড্রাইভার, আবার কখনো বন বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে...
শায়েস্তাগঞ্জ রেঞ্জ কর্মকর্তার নির্দেশে লাখাইয়ের করাতকলে বন কর্মকর্তা পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় অবৈধ করাতকলে মোবাইল কোর্ট ও মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তারা নিজেদের...
সদর হাসপাতালে নার্সের বদলে আয়ার ইনজেকশন পুশ,জন্মের ২৪ ঘণ্টার মাথায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ
নার্সের পরিবর্তে আয়া দিয়ে ইনজেকশন পুশ করানোর অভিযোগে জন্ম নেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় ফুটফুটে এক নবজাতক পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয়েছে...
শিশু যৌন নিপীড়ন: মালয়েশিয়ায় গ্রেপ্তার বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিল এফবিআই
মালয়শিয়ায় আটকের পর এক বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে মার্কিন ফেডারেল ব্যুরু অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। জোবাইদুল আমিন (২৮) নামের ওই বাংলাদেশির...
বাহুবল–নবীগঞ্জ সার্কেলের এএসপি জহিরুল ইসলামের বদলি
হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল–নবীগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) জহিরুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের এক আদেশে তাঁকে...
সিলেটে মাজার প্রাঙ্গনে রাজনৈতিক শ্লোগান দেশে বিদেশে আলোচন-সমালোচনার ঝড়
৩৬০ অন্যতম হযরত শাহ জালাল (র.) মাজার জিয়ারত করতে এসে একটি নব্য রাজনৈতিক দলের সদস্যরা পবিত্র নগরী সিলেটে মাজার প্রাঙ্গনে...
