“লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”—এখন আর কেবল পড়ালেখা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। দেশে শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের বাস্তবতা, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জটিল সমীকরণে শিক্ষার্থীরা আজ প্রশ্ন করে—এই দেশে থেকে কী আদৌ ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব?
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন এবং মালয়েশিয়া—এই দেশগুলো এখন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য।
কিন্তু কেন এই অভিবাসনের প্রবণতা এত বাড়ছে?
প্রথমত, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ, সেশনজট এখনো বাস্তবতা, আর পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী নয়। ফলাফল—একটি ডিগ্রি অর্জনের পরেও চাকরি পাওয়া অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো চাকরি পেতে “যোগ্যতা” নয় বরং “সুপারিশ” বেশি কার্যকর। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দেখা যায়—ভালো ফলাফল ও স্কিল থাকার পরও চাকরি পাচ্ছেন না শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাবান পরিচিতি না থাকার কারণে। এই অবস্থায় তরুণরা যখন দেখতে পায়, দেশের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে তাদের কোনও ভরসা নেই, তখন তারা বিদেশকে বেছে নিচ্ছে একটি “বিকল্প স্বপ্ন” হিসেবে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার চেয়ে রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগ থেকে ক্যাম্পাস প্রশাসন পর্যন্ত দলীয় দখলদারিত্ব বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার প্রতীক।
ফলে অনেকেই কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং স্থায়ীভাবে বিদেশে সেটেল হওয়ার উদ্দেশ্যেই উচ্চশিক্ষার প্যাকেজ নিচ্ছেন। দেখা যায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার শেষে অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর দেশে ফিরতে চান না। কারণ দেশে ফিরে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, সুপারিশনির্ভর, অনিশ্চিত একটি ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে চান না।
এখানে সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। এখনো বিদেশে পড়তে যাওয়া একটি মর্যাদার প্রতীক, “ছেলে বা মেয়ে বিদেশে”—এই পরিচয় সামাজিক স্ট্যাটাসে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা যেন একপ্রকার ‘পাসপোর্ট টু সেটেলমেন্ট’-এ রূপ নিচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা সম্ভব, যদি আমরা শিক্ষাকে শুধুমাত্র সার্টিফিকেটভিত্তিক না রেখে দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসি। প্রয়োজন:
স্বচ্ছ ও দলনিরপেক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা,
যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম,
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি,
কর্মসংস্থানের সঙ্গে একাডেমিয়ার সেতুবন্ধন তৈরি করা,
ছাত্র রাজনীতিকে শিক্ষাবান্ধব করার উদ্যোগ।
সরকার চাইলে উচ্চশিক্ষার এই “ব্রেইন ড্রেইন” পরিস্থিতিকে “ব্রেইন গেইনে” রূপান্তর করতে পারে। নীতিগতভাবে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে দেশে ফেরাতে উৎসাহিত করা এবং তাদের মেধা দেশের জন্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাটাই এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড, তবে সেই মেরুদণ্ড আজ দুর্বল ও ভঙ্গুর। আমরা যদি চাহিদাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিদেশমুখিতা রোধ নয়, বরং “দেশবিমুখতা” আমাদের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করবে।
লেখক ও বিশ্লেষক: নুর হোসেন সোহেল।পিএইচ-ডি গবেষক, যুক্তরাজ্য।