ভাষা আন্দোলনেই প্রথম নারীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে : ড. মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির

Mar 14, 2023 - 02:30
Mar 14, 2023 - 02:44
 0  99
ভাষা আন্দোলনেই প্রথম নারীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে : ড. মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেছেন, এ দেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হওয়া আন্দোলনেই নারীরা প্রথম ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ করে।

 রোববার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ভাষা আন্দোলন ও নারী : বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সংগ্রাম ও প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক এক স্মারক বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ‘অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুন ট্রাস্ট ফান্ড’ এ স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এ সময় স্মারক বক্তা ড. হুমায়ুন কবির নারীদের অবদান স্বীকার পূর্বক আরও বলেন, যেসব নারীরা ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন, তারা অনেক বড় সাহসের কাজ করেছেন।১৯৪৮ এর আগে সচরাচর কোনো আন্দোলনেই নারীরা অংশগ্রহণ করেনি। ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। যার ফল হিসেবে পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় বাংলা।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে লেখালেখিতে নারীরাও অনেক এগিয়ে ছিলেন। সে সময়কার জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বেগম’-এ পশ্চিম পাকিস্তানে না হলেও অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি জানানো হয় ১৯৪৭ এর আগস্টেই। সিরিজ আকারে বেশকিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল সে সময়। যাতে দাবি জানানো হয় ভাষা দ্বন্দ্বে বাংলার পক্ষে দাঁড়ানোর।

 ভাষা আন্দোলনে নারীদের ত্যাগের বিষয়ে ড. হুমায়ুন কবির বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে সুফিয়া ইব্রাহিম, সাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু শামসুন্নাহারসহ কতিপয় নারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ছাত্রদের দু-তিনটি দল ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পরেই এ নারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে আসেন।

 পাকিস্তানি পুলিশ নারীদের ওপরও হামলা চালায়। কেউ হাতে, কেউ পায়ে, কেউ পিঠে আঘাত পায়। মেয়েদের ওপর হামলার খবর শুনে ছাত্ররা রীতিমতো ফুঁসে ওঠে। আন্দোলন বেগবান হয়, যার প্রেক্ষিতে গুলিবর্ষণ হলে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই শহীদ হন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য টাকার দরকার ছিল। সে সময় মেয়েরা এগিয়ে আসে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না।

অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুন স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামানের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।

তার অনুপস্থিতিতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হওয়া আন্দোলন যতটা না রাজনৈতিক ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল অর্থনৈতিক। বাংলা ভাষাকে দমিয়ে রেখে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করাই ছিল শাসকদের মুখ্য উদ্দেশ্য।

মূলত অর্থনৈতিক অসাম্য এবং বাংলা ভাষার প্রতি হওয়া আক্রমণ থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। যা পর্যায়ক্রমে ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সাধারণ নির্বাচন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। এ আন্দোলনের অর্থনৈতিক দিক এবং নারীর অংশগ্রহণ, এই দুটি ক্ষেত্রে আজকের দিনে বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

সভাপতির বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানি শাসকদের দেওয়া যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, পাকিস্তানিরা যে বাংলাকে হিন্দুয়ানি ভাষা বলেছিল, এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলা বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলা ভাষার বিকাশ মুসলিমদের হাত ধরে। তৎকালীন হিন্দু ব্রাহ্মণরা তো সংস্কৃতকে ধারণ করে চলতে চেয়েছিল, বাংলাকে ধারণ করে নয়। তাহলে বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা হয় কীভাবে?

 ইতিহাস তো বলে বাংলা ভাষা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব জনসাধারণের ভাষা। উল্লেখ্য, করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে পঞ্চমবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুন ট্রাস্ট ফান্ড লেকচার-২০২১। এর প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান বৃদ্ধি ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করা।

এ স্মারক বক্তব্যের সংকলন প্রকাশ করার ঘোষণা দেন সভাপতি অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. মো. সাইফুল্লাহ, ড. আতাউর রহমান বিশ্বাস, ড. মো. ইবরাহীম, অধ্যাপক ড. নাজমা খান মজলিস, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক মিন্টু আলী বিশ্বাস প্রমুখ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow